XNAT - Explore the Nature

XNAT - Explore the Nature

Share

Pranab Chowdhury.

This page is based on environment or nature , where we will traveled with a dreamy exile to our destination , having a lots of unknown places , uncanny situations , wonderful scenarios writing with you ,
thanks & regards ..

Photos from XNAT - Explore the Nature's post 02/03/2026

পেঞ্চের শেষবেলা -->
# # # # # # # # # # # # #
৪ র্থ পর্ব - ৪/১/২০২৬
>>>>>>>>>>>>>>>
বাঘ - না অশরীরী আত্মা!!!
~~~~~~~~~~~~~~~
Rudyard Kipling এর অমর সৃষ্টি Jungle Book এর নায়ক মৌগলি বাদে সব চরিত্রের সাথেই সিওনি জেলার পেঞ্চ গ্রামে এসে দেখা হয়ে গেল। Kipling এর child fantacy Robert Baden Powell স্কাউট এর সিলেবাসে ঢুকিয়ে দেওয়ায় Rik Chowdhury দের স্কুলে স্কাউট ক্লাসের সময় থেকে পেঞ্চ নিয়ে একটা কাল্পনিক ধারণা হয়েছিল। Kipling ভদ্রলোক কখনো পেঞ্চে আসেননি, অথচ কি শিল্পীস্বত্বা দেখুন, তার Jungle Book পড়লে মনে হবে, যেন আপনি সত্যি সত্যি পেঞ্চে বসে আছেন এবং সাহেবের কাছে গল্পটা শুনে চলেছেন ।
পেঞ্চের অরণ্যশোভা, পাহাড়ি রাস্তায় সাফারির এডভেঞ্চার, অনেক অচেনা পাখির সমারোহ, জঙ্গলের ডাক এর ওপর নির্ভর করে পশুর গতিশীলতা পর্যবেক্ষণ ; সত্যিই অনন্য অভিজ্ঞতা।
শেষ সকালে কুয়াশা ঘেরা রাস্তা দিয়ে জিপসি টুরিয়া গেটে পৌঁছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরী করে জঙ্গলে প্রবেশের সময় মাঝবয়সী এক গাইড গাড়িতে উঠে এলেন। সামনের রাস্তায় বেশ ঘন কুয়াশা থাকায় ১০০ মিটার দূরের বস্তু ও দেখতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। আজ জঙ্গল একদম নিঝুম, দুপাশের গাছগুলো সূর্য ওঠার অপেক্ষায় মাথা ঝুঁকিয়ে ট্রাফিক পুলিশের মতো ঝিমিয়ে রয়েছে।
কিছুদূর চলে আসার পরে Tabaqui এর দলের সাথে মোলাকাত হলো। মৌগলীর এক পার্শ্বচরিত্র হলো এই Tabaqui বা ভারতীয় শিয়াল - সাধারণত Golden Jackel, Black Backed Jackel প্রভৃতি প্রজাতির সাথেই আমাদের জঙ্গলে বেশি দেখা হয়ে থাকে। শিয়ালের দল রাস্তার ধারে প্রাতকৃত্য সারার সাথে সাথে সঙ্গিনীদের সাথে প্রাক প্রজননকালীন প্রেমের আদবকায়দা গুলি বজায় রেখে deep commitment স্থাপন করে চলছিল। জানুয়ারীর শীতে স্ত্রী প্রজাতির যে প্রাণীটি প্রথমবারের জন্য রজস্বলা হয়ে ওঠে, পুরুষ মহলে তাকে পাওয়ার জন্য একটা আলোড়ন সৃষ্টি এবং সেই সঙ্গীনিকে পাওয়ার আকাঙ্খায় একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। বিজয়ী সঙ্গী এরপরে তার সঙ্গিনীর সাথে একত্রে ঘুরে বেড়ানো, ও স্প্রে মারফত এলাকা দখলে রাখার সাথে স্ত্রী প্রাণীটি তার লেজটা উপরে তুলে জননাঙ্গ প্রদর্শন করে , গায়ের লোম খাড়া করে সঙ্গী কে আকৃষ্ট করে। তাদের মধ্যে হাল্কা একটা আদরসুলভ মারপিট এবং যৌনাঙ্গ স্বাদ কোরকের দ্বারা পরখ করে নেওয়ার পরে তাদের মধ্যে সংগম হয়, এর সময়সীমা দফায় দফায় সপ্তাহখানেক ধরে চলতে থাকে এবং সংগমের শেষদিকে ৫-৭ মিনিট পর্যন্ত দুজনের যৌনাঙ্গ আটকে থাকে। স্ত্রী গর্ভবতী হয়েছে বোঝার পরে পুরুষ শিকার করে এনে খাবারটা বমি করে তাকে খেতে দেয়। মার্চ এপ্রিলে এদের বাচ্ছা জন্ম নেয়।
কিছুক্ষন তাদেরকে দেখার পরে আমরা সামনে এগিয়ে একটা গাউরের পরিবারের দেখা পেলাম, তারা অলসভাবে দাঁড়িয়ে জাবর কেটে চলেছিল।
গাইড ড্রাইভারকে বাঘিন নালা থেকে কালাপাহাড় গিয়ে তারপর আলিকাট্টা তৃণভূমিতে পৌঁছতে বলল। বাঘিন নালায় কাল বিকালেও আমরা এসেছি, এখানে যে চওড়া নালাটা আছে, গ্রীষ্মে সাফারিতে এসে কোথাও বাঘ না দেখতে পেলেও এখানের ছায়াঘন শীতল পরিবেশে নিশ্চিতভাবেই বাঘের দেখা পাওয়া যাবে।
আমরা পাশের একটা শালগাছের ওপর একটা crested serpent eagle দেখতে পেলাম, বাঁদিকে সোনালী রঙা ঘাসজমিতে দারুন ক্যামোফ্লেজ করে বসে থাকা ঝাঁকে ঝাঁকে Blyths Pipit , যা একপ্রকার চড়াই প্রজাতির পাখি দেখতে পেলাম , এরা শস্যখেতে বসবাস করে থাকে। এদের সাথে Paddyfield Pipit কে প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয়। কাছাকাছি আরেকটা অন্য প্রজাতির পাখি বসে থাকতে দেখলাম , এগুলো একটু বড়ো আকারের অনেকটা সারসের মত দেখতে, নাম Thick Knee, একটু বড়ো আকারের আর গায়ে বাদামি ডোরা দাগ , এরা মাঠ থেকে পোকামাকড় খায়। আরেকটু এগিয়ে রাস্তার একটা বাঁকে একটা তালাও দেখলাম যা জুনেওয়ানি লেক নামে পরিচিত , এখানেও জলের ওপরে কয়েকটি গাছ খাড়া ভাবে দাঁড়িয়ে বেঁচে রয়েছে । একটা White breasted kingfisher সামনের একটা শাল গাছের শুকনো ডালে বসে বসে পালকের পরিচর্যা করে চলেছিল।
এবারে জিপসি লেক ছেড়ে এগোতে এগোতে ক্রমশ একটা উঁচু পাহাড়ের দিকে উঠতে শুরু করলো, রাস্তার বাঁকে বাঁকে পাথরের স্তুপগুলো পাহাড়ের ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত। পাহাড়ের ওপরে প্রধানত শালের জঙ্গলে কোনো পশুর দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে হলো। হঠাৎই একটা চুলের কাঁটার মতো বাঁক ঘোরার পরে গাইডের ইশারায় গাড়িটা থামতে বাঁদিকে ১০ ফুট উঁচু ও ত্রিশ ফুট চওড়া একটা পাথর চোখে পড়লো , যা পাহাড়ের ঢাল বরাবর নেমে এসেছে, স্লেটের মতো পাথরটির বেশ কয়েকটা খাঁজের মধ্যে ছ সাতটা বুনো কুকুর অঘোরে ঘুমিয়ে রয়েছে দেখলাম। দীর্ঘ একটা রাত জাগার পরে তারা সকালে একটা শান্তির নিশ্চিন্ত ঘুম ঘুমাচ্ছে। আমাদের কথাবার্তা তাদের নিদ্রায় কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে পারল না অথবা তারা আমাদের গলার শব্দকে পাত্তা না দিয়ে শুয়ে রইল । তাদেরকে ছেড়ে আমরা পাহাড়ের রাস্তা ধরে আরো সামনে উঠতে লাগলাম। হঠাৎ পাশের ঘেসো জমিতে একটা বড়োসড়ো বনবরাহ দৌড়ে চলে যেতে দেখলাম, টাডোবা থেকে নাগপুরে ফেরার সময় অন্তত তিনটি বুনো শুয়োর কে হাইওয়ে রাস্তায় মরে পরে থাকতে দেখেছিলাম, হয়তো মিসকালো রঙ এর জন্তুটিকে রাতে দেখতে না পেয়ে গাড়ি চাপা দিয়ে ফেলেছিল, আর বনদপ্তর তাদের সদগতি করতে না আসায় এই সরকারি সম্পত্তি রাস্তায় ঐভাবে ই পড়ে ছিল । আমরা এর আগেও বনবরাহ দেখেছিলাম চিতওয়ানে ।
জঙ্গলের মধ্যে আবার আমরা এগোতে থাকলাম। জিপসি একটা পাহাড়ের ধাপে এসে দাঁড়ালো, এখানে পাহাড় আমাদের ওপরে যতটা উঁচুতে, নিচ থেকে ও ততটা উঁচুতে আমরা রয়েছি, অর্থাৎ আমরা পাহাড়ের মাঝামাঝি। নিচের উপত্যকা দিয়ে দুটো কালো পিঠওয়ালা শিয়াল দৌড়ে এগোচ্ছিল, হঠাৎই আমাদের গাইড মুখের দুদিকে হাত রেখে অবিকল ভাবে শিয়ালের ডাক ডেকে ওঠায় তারা চমকে একবার ওপরে তাকিয়ে আমাদের দেখতে পেয়ে আবার দৌড়োলো, সামনে পাহাড়ের ওপরে আরো খানিকটা ওঠার পরে আমরা একটা সমতল জায়গায় এসে পৌঁছলাম, এখানে একটু দাঁড়িয়ে, আমরা বাঁদিকে একটা বাঁক ঘুরে জিপসিটা যেখানে থামলো, তার সামনে রাস্তার দুদিকে ছ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট এবং কুড়ি ফুট চওড়া পাথর দুদিকে অবস্থান করে মাঝে একটা গলিপথ সৃষ্টি করেছে, জিপসিটা এগিয়ে যেইমাত্র গলিটা পার হয়েছে, তখনি সামনে ডানদিকে, উপত্যকা থেকে একদল চিতল হরিণের দফায় দফায় উৎকন্ঠীত ও ভয়ার্ত ডাক ভেসে এলো। সাথে সাথে আমাদের জিপসিটা আর এক পা 'ও না এগিয়ে স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে গেল। কিছুক্ষনের মধ্যে আবার একটানা হরিণের উৎকণ্ঠা মিশ্রিত ডাকের শব্দ সামনের দিক থেকে আসতে থাকায় এবার আমরা জোরে জিপসি চালিয়ে সামনের দিকে এগোলাম। কিছুটা এগোতে, ডানদিকের উপত্যকায় কয়েকটা ভীত সন্ত্রস্ত চিতলকে ওপরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমরা দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করতে শুরু করলাম যে হরিণ গুলো বাঘ দেখেই ভয় পেয়ে গিয়েছে।
এই জায়গাটার একটা বর্ণনা দরকার, জায়গাটার নাম কালাপাহাড় জোন। দুদিকে ঢাল হয়ে নেমে যাওয়া উপত্যকার মাঝে একটা ত্রিশ ফুট চওড়া রাস্তা, ঠিক মোষের পিঠের মত সামনের দিকে চলে গিয়েছে। জিপসি টা আরো এগোতে আমাদের সামনের রাস্তার ওপর ৭-৮ ফুট সামনেই টাটকা রক্তের দাগ দেখতে পেলাম। গাইড আমাদের বাঁদিকে ঝোপের দিকে দেখতে দেখতে ফিসফিসিয়ে বলল বাঁদিকের ঝোপে লেপার্ড, স্যার দেখে নিন। আমরা সকলে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে দেখতে দেখতে লেপার্ড এর গোল গোল ছাপওয়ালা হলুদ শরীরটা দেখতে পেলাম। গাইড বলে চলল, লেপার্ড টি একটা হরিণ ডান দিকের উপত্যকা থেকে শিকার করে তা টেনে নিয়ে রাস্তা পাড় হয়ে বাঁদিকের উপত্যকায় আমরা আসার কয়েক মুহুর্ত আগে নেমে গিয়েছে। এর পরেই আমরা লেপার্ড টার নড়াচড়া স্পষ্টভাবে বুঝতে পারলাম। সেটি শিকারকে মাটিতে রেখে দাঁড়িয়ে পড়ে দেখছিলো, তারপর একটু সামনের দিকে চলে, আবার পিছনে ঘুরে ঘুরে বারবার সন্দীগ্ধ ভাবে কিছু দেখা বা বোঝার চেষ্টা করে চলেছিল। আর অবশেষে বনের ভিতর অদৃশ্য হয়ে পড়লো। গত কাল বিকালের লেপার্ডটা ছিল মাদী বা স্ত্রী প্রজাতির, আর আজকেরটি পুরুষ বা মদ্দা। লেপার্ড টি জঙ্গলের ভিতর চলে যাওয়ার পরে ড্রাইভার জিপসিটা উল্টো দিকে মুখ করে ঘুরিয়ে রাখলো।
আমরা এখানে লেপার্ড টা বেরিয়ে আসতে পারে আশা করে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকবো ঠিক করলাম। দূর থেকে বনদপ্তরের একটা সাদা রঙের মাথা ঢাকা দেওয়া জিপ আসতে দেখা গেল। জিপসিটা আমাদের পিছনে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় দেখলাম ভেতরে একজন ভদ্রমহিলা ও দুটি শিশু বসে আছে। দুজন গাইড তাদের সামনের সিটে বসে। আমাদের গাইড জানাল উনি DFO সাহেবের স্ত্রী, বাচ্ছাদের নিয়ে জঙ্গলে ছুটিতে ঘুরতে এসেছেন । গাড়িটা আমাদের জিপসি থেকে ৩০ মিটার দুরত্বের একটা গ্যাপ রেখে দাঁড়িয়ে পড়লো। ঐদিকে আরো দুটি জিপসি এসে সাদা গাড়িটার পাশে এসে দাঁড়িয়ে গেল।
লেপার্ড এর জঙ্গলে ঢুকে পড়ার পরে জঙ্গল শান্ত হয়ে গিয়েছিল। আচমকা আমাদের বাঁদিক থেকে চিতলের পরপর কয়েকটা সতর্কিকরণ সূচক ডাক শুনতে পাওয়া গেল, এবং সাথে সাথে এই গাড়িগুলি থেকে আসা মৃদু গুঞ্জন থেমে গেল। কোনো এক অজানা আশ্চর্যজনক ঘটনার পূর্বাভাস আমার মনে ঝিলিক দেওয়ায়, আমি ড্রাইভার কে জিপসি টার স্টার্ট বন্ধ রাখতে বললাম। আমার ও ড্রাইভারের মুখ ছিল গাড়ির সামনের দিকে। গাইড বাঁদিকের হরিণের দলটা দেখে চলেছিল। আর Rik সিটে দাঁড়িয়ে ডানদিকে লেপার্ড এর অস্তিত্ব খুঁজতে খুঁজতে ক্যামেরায় হাত রেখে ঝোপ গুলির দিকে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছিলো, হঠাৎ ফিসফিস করে বলল, "বাপি পিছনে টাইগার! " আমি ও গাইড সাথে সাথে ১৮০°ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি ডানপাশের ঝোপটা থেকে একটা পুরুষ বাঘ বেরিয়ে এসে পুলিশ কুকুরের মত রাস্তায় পড়ে থাকা হরিণ এর রক্তটা শুঁকতে শুঁকতে রাস্তাটার মাঝ বরাবর আসছে। তারপর রাস্তা থেকে বাঁদিকের নাবালে খানিকটা নেমে গিয়ে আবার উঠে এসে রাস্তা পেরিয়ে ডানদিকে লেপার্ড টার চলে যাওয়া পথ বরাবর খানিকটা সোজা এগিয়ে, আবার পিছনে ঘুরে ঠিক লেপার্ড টার মত একই পথে জঙ্গলের গভীরে ঢুকে পড়লো।
আমরা ঘটনার আকস্মিকতায় অন্তত মিনিটখানেক হতভম্ব হয়ে গেছিলাম। Rik বলল, "আমি লেন্সের ওপর ধুলো পড়েছে কি না সেদিকে দেখছিলাম, আর মাঝে মাঝে লেপার্ড এর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম, হঠাৎই একটা ঝোপের ফাঁকে চোখটা আটকে গেলো, ঝোপটা দুলে উঠল, আর একটা বড়োসড়ো বাঘ বেরিয়ে এসে রাস্তার দিকে আসতে দেখে তোমাকে ডাকলাম।"
বাঘটা জঙ্গলে ঢুকে যাওয়ার পরে ভেবেছিলাম ওটা লেপার্ড এর খোঁজে জঙ্গলে ঢুকে শিকারটা কেড়ে নেবে, অথবা লেপার্ড টাকে মেরে ফেলবে। কিন্তু পরক্ষনেই মনে হলো লেপার্ড ও অত্যন্ত ক্ষীপ্র ও ধূর্ত প্রাণী, তাই তার থেকে শিকার কেড়ে নেওয়া বা তাকে মেরে ফেলা খুব সহজ হবেনা, বিপদ বুঝলে সে আত্মরক্ষা করতে কোনো উঁচু গাছে উঠে পড়বে ।
মিনিট দশেক অপেক্ষায় থেকে আমরা ফিরতে শুরু করলাম। আমরা পাথরদুটির মাঝে গলিটা পেরোনোর পরে গাইড ডানদিকে একটা জারুল গাছের কাণ্ডে বাঘটির নখের গভীর আঁচড়, এবং মার্কিং স্প্রের তরল দেখাল, যা এখনো ভিজে রয়েছে দেখলাম। কয়েক মিটার এগিয়ে রাস্তার ওপর বাঘটির বিষ্ঠা পড়ে থাকতে দেখলাম। বিড়াল গোষ্ঠীর প্রাণীরা যেমন বিষ্ঠা ত্যাগের পরে পা দিয়ে মাটি আঁচড়ায় সেরকম আঁচড়ের দাগ বাঘটি করার পরে ধুলো দিয়ে বিষ্টা ঢেকে আমাদের অভিমুখ বরাবর চলছিল।
আমরা এখানে দাঁড়িয়ে পড়ে স্তভিত ভাবে আলোচনা করছিলাম যে, বাঘটা কতখানি নিঃশ্বব্দে আমাদের থেকে আন্দাজ ত্রিশ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের ঠিক পিছনে পিছনে আসছিলো, তারপর চিতাটার গায়ের গন্ধ পেয়ে বাঁদিকের ঢালে নেমে গিয়ে মৃত হরিণটির রক্ত শুঁকে রাস্তায় উঠে এসেছিলো, একটা পাতা ঝরে পড়লেও যে শব্দ হয়, ন্যূনতম সেটুকু শব্দও না করে, একটা প্রেতের মতো অতি নিঃশ্বব্দে তার এই চলাফেরা বইতে পড়েছি, আজ অনুভব করলাম । শুধুমাত্র খুব কাছে আসার পরে তার গায়ের গন্ধ পেয়ে হরিণ গুলো ডেকে না উঠলে, এবং Rik বাঘটির আসার পথের দিকে তাকিয়ে না থাকলে বাঘটা রাস্তায় উঠে আবার বনে ঢুকে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের কারো পক্ষেই তার উপস্থিতি ঘুনাক্ষরে ও বুঝতে পারা সম্ভব হত না।
সাফারি সেরে ফিরে, স্নান করে লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে, মিঃ চৌহান কে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠে রামটেক নামলাম। শ্রীরামের চরণ স্পর্শের পরে রাস্তায় একটা ধাবায় দুপুরের খাওয়া শেষ করে, বিকালে নাগপুর পৌঁছে রাতে বিশ্রাম,এবং পরদিন ভোরে কুয়াশাঘন আকাশ ফুঁড়ে কলকাতার কনকনে আবহাওয়ায় এসে পৌঁছানো ।

🪔🪔🪔🙏🪔🪔🪔
(শেষ )

Photos from XNAT - Explore the Nature's post 02/03/2026

পেঞ্চে WISH FULFILLMENT ---->
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

৩য় পর্ব-- ৩/১/২০২৬

সাঁড়াশি আক্রমণে চিতা --->

সন্ধ্যায় সাফারি সেরে ফিরে রিসেপশনে দেবেন্দ্রর সাথে দেখা, একগাল হেসে কি দেখলাম জিজ্ঞাসা করাতে, ঋক তাকে আজকে লেপার্ড দেখেছি বলল , দেবেন্দ্র জানাল আজ সকালে হোটেলের এক দম্পতি খাওয়াসা সাফারিতে লেপার্ড দেখেছে, বলে সে মোবাইল খুলে ঋক কে একটা ভিডিও দেখাচ্ছিল ভিডিওটি ৮-১০ সেকেন্ডের, একটা লেপার্ড দৌড়ে রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছে , ঋক তার ক্যামেরা বার করে আজকের তোলা ছবিগুলো দেখানোর পরে দেবেন্দ্র তাকে গদগদ ভাবে "please ঋক স্যার হামে য়ে তাসবির ভেজিয়ে " বলে অনুরোধ করায় ঋক তার নম্বর টা নিয়ে রাখলো। দেবেন্দ্র আমরা কখন মাচানে উঠব জিজ্ঞাসা করায় আমি ৭:৩০ টায় আসছি বললাম। আমরা ঘরে ফিরে এলাম, ঋককে একটা অফিসিয়াল গুগল মিট এ যোগ দিতে হওয়ায় আমি একাই যাবো স্থির করে দেবেন্দ্রকে ডেকে নিলাম। সে একটা টর্চ ও ফ্ল্যাকসে চা নিয়ে মিনিট দশেকের মধ্যে হাজির হলো, আমি মোবাইলটা পকেটে নিয়ে রুম এর বাইরে বেরোলাম, সাথে সাথে একটা শীতল হাওয়ার ঝলকানি আমায় আলিঙ্গন করলো। দেবেন্দ্র জানাল আজকের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭°C হবে জানিয়েছে। মাংকি টুপিটা পড়ে বেড়ানোর জন্য মনে মনে নিজেকে ধন্যবাদ জানালাম। আমাদের রেস্ট হাউস টা একটা গ্রামের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আমাদের রুম একেবারে শেষে, রেস্ট হাউসের পিছনদিকে, আমাদের শোবার ঘরের পিছনে গ্রামের শেষ সীমানা, তারপর জঙ্গল শুরু। এদিকে দিনের বেলায় ও লোকজন আসেনা। জ্যোছনা রাতে সামনের দিকে ২৫-৩০ মিটার হেঁটে কাঁটাতারের বাউন্ডারীর ঠিক বাইরে মাচানটার সামনে এসে পৌঁছলাম।আমরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার পরে দেবেন্দ্র ফ্ল্যাক্স ও টর্চটা একটা টুলে রেখে পাশে দাঁড়ালো, সে বলল, সুব্বাইয়া নাল্লা মুথু স্যার যখন আসেন মিঃ চৌহান তাকে এখানে বসার বন্দোবস্ত করে দেন। আপনিও দেখছি ওনার মতোই nature lover ! শুক্লার মুখে নাল্লা মুথুর ব্যাপারে শুনেছিলাম, উনি চেন্নাইয়ান, বিখ্যাত একজন wildlife photographer, অনেক সরকারি সন্মান ও ওর ঝুলিতে রয়েছে, এ হেন ব্যক্তিত্বের সাথে আমার তুলনা করে দেবেন্দ্র মনটাকে একটু মাতাল করে দিল। দেবেন্দ্র অন্ধকার জঙ্গলের দিকে দেখিয়ে জানাল সেটা খাওয়াসা বাফার জোনের মধ্যে পড়ে। কখনো কখনো লেপার্ড গ্রামের দিকে ছাগল বা কুকুরের লোভে হাজির হয়, এখানে আপনি শিয়াল, বা রাতচরা পাখি দেখতে পাবেন। এই বলে সে আমাকে মোবাইল টা নিস্তব্ধ রাখতে বলে বিদায় জানালো, এবং ফেরার সময়ে তাকে একটা কল করলে সে চলে আসবে জানিয়ে মাচানের নিচে নেমে গেল। আমি ফোনটা সুইচ অফ করে তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতে শুনলাম, তারপর মাচানের রেলিং এর সামনে দাঁড়িয়ে চারদিকটা দেখতে লাগলাম। পূর্ণিমার আলোতে চারদিকে বেশ অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, সামনে মাচানের ওপরে দুটি বাঁশ গাছ ঝুঁকে রয়েছে, যার ফাঁক দিয়ে লালচে রঙা গোল চাঁদ আকাশে ভেসে রয়েছে, পিছনদিকে একটা ফসলকাটা জমি, ডানদিকে গ্রামের শেষ বাড়িটিতে এখন বোধহয় রান্না হচ্ছে, ঘড়িতে ৭:৫০ বাজে, আমার বাঁদিকে এবং সামনে বিস্তৃত জঙ্গল মিসকালো ও গহীন। বাঁশগাছ ও মাচানের আশেপাশে ঝিঁঝিপোকা হাল্কা ভাবে ডেকে চলেছে। আমি রেলিংটা ধরে দূরের দিকে আনমনা ভাবে তাকিয়ে রয়েছি, হঠাৎ বাঁদিকে একটা গাছের ওপরে spotted owlet এর কিচকিচানি শোনা গেল, প্রথমে থেমে থেমে, তারপর একটানা ডাকতে লাগলো। একটা Barn owl বা লক্ষী পেঁচার তীক্ষ্ণ চিৎকার পিছনের জমিটা থেকে শোনা গেল, হয়তো কোনো শিকার অথবা অন্য পেঁচাকে দেখে ডেকে উঠল। বেশ কিছু নিশ্চলভাবে অতিবাহিত সময়ের পরে, যখন ঘড়িতে ৮:২৫ বাজে, একটানা দাঁড়িয়ে থাকার পরে একটু বসার জন্য টুলটার দিকে দিকে ঝুঁকতে গিয়ে বাঁদিকে মাঠের দিকে তাকিয়ে মনে হলো জমির আল্ ধরে কতকগুলো কুকুরের একটি দল জঙ্গলের দিকে এগিয়ে চলেছে, মনে প্রশ্ন এলো এতগুলো কুকুর রাতে একসাথে কেন ? এ গুলো হয়তো শিয়াল! জন্তুগুলি নিশ্বব্দে হাটছিলো, খুব কাছাকাছি আসার পরে বুঝলাম এগুলো শিয়াল। Indian golden jackel. এরা শেষ সন্ধ্যায় গ্রামের আশেপাশে যদি কিছু খাবার পাওয়া যায় সেই খোঁজে বেরিয়েছে। শিয়ালগুলো গ্রাম ও জঙ্গলের মাঝামাঝি কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে জঙ্গলের অন্ধকারে মিশে গেল। আবার সামনে চিত্রহীন পটভূমি। প্রায় আধ ঘন্টার কাছাকাছি সময়ে হঠাৎই একটা হিমেল উত্তরে হাওয়া বইতে শুরু করলো, আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঠান্ডায় নাক - মুখে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে কাঁপুনিটা হাড় পর্যন্ত অনুভূত হতে লাগলো। শরীরে একটা বিচিত্র ঠকঠকানি শুরু হয়ে দাঁতের সাথে দাঁতের ঠোকাঠুকি চালু হয়ে গেল। অতি দ্রুত ফ্ল্যাক্স থেকে চা বার করে পরপর দুকাপ চা খেয়েও অস্বস্তি টা কাটছিলো না। নাগপুর থেকে আনা দুটো কড়া জর্দাপান একসাথে মুখে নিয়ে কিছুটা স্বস্তি লাগলেও, সারাদিনের সাফারির ধকল ও চিতা দেখতে তৈরী হওয়া উত্তেজনার প্রভাবে শরীর এবার বিশ্রামের খোঁজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তাই মোবাইল অন করে, ফ্ল্যাক্স টা তুলে এবং টর্চ টা জ্বালিয়ে মাচান থেকে নেমে আমার ঘর পর্যন্ত হাঁটা দিলাম।
*********
রাতে বিছানার উষ্ণতায় এসে বিকালের সাফারি মনে রোমন্থন হতে লাগল। বাইরে spotted owlet গুলোর কিচ কিচ ঝগড়ার মাঝে illusive একটা perspective মনে তৈরী হয়ে ঘটনার প্রবাহে মনকে তলিয়ে নিয়ে গেল।
আজ বিকালে টুরিয়া গেটে কোর অঞ্চলে সাফারি ছিল। এটা এই পার্কের প্রধান ফটক, পার্কের প্রধান আকর্ষণস্থল। সুসজ্জিত গেটটি দিয়ে জঙ্গলে প্রবেশের আগে বাঁদিকে পারমিট দেওয়ার সময়ে বেশ কড়াকড়ি চেকিং ছিল। এলকোহল এর গন্ধ পরীক্ষা, প্লাস্টিক বোতল, মোবাইল ফোন সমস্ত পরীক্ষাগুলো পাশ করার পরে প্রবেশ অধিকার দেওয়া হচ্ছিলো।
গাইড ভদ্রমহিলা ত্রিশোর্ধা, যথেষ্ট জঙ্গল সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা রয়েছে। চলার শুরুতেই উনি আমাদের বাঁপাশে একটা সেগুনগাছের ঘন পাতার ফাঁকে অন্ধকারে Forest owlet দেখালেন। আমরা অতি কষ্টে অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘন পাতার ফাঁকে পেঁচাটি দেখলাম।
পেঁচাটি দেখে সামনের দিকে গাড়ি এগোতে থাকল, হঠাৎই ঋক বাঘের ডাক শুনতে পেল। গাড়ি থামিয়ে আমরাও শোনার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, ও ঠিকই শুনেছে, আমাদের বাঁদিকে প্রায় আধমাইল দূরে একটা বাঘের জোরালো ডাক কানে ভেসে এলো। জিপসি তাড়াতাড়ি চলে সামনের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো, ইতিমধ্যে বাঘটা আরো দু তিনবার গর্জন করে উঠল, ডাক শুনে বোঝা গেল,বাঘটা ক্রমশ আমাদের কাছাকাছি এগিয়ে আসছে। ঠিক তিন চার মিনিটের মধ্যে আমাদের ডানদিক থেকে একটা বাঘের গর্জন কানে এল। এই গর্জনটা বাঁদিকের টা অপেক্ষা অনেক জোরালো এবং হাড়হিম করা তার অনুরণন। এতক্ষনে আমরা দুটো বাঘের অস্তিত্ব বুঝতে পারলাম। দুটি বাঘ আমাদের সমান্তরালে দুদিকের জঙ্গল ধরে চলেছে। যারমধ্যে বাঁদিকের টা বাঘিনী এবং ডানদিকেরটা পুরুষ বাঘ। গাইড ভদ্রমহিলা ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে বললেন। আমরা দুদিকের জঙ্গলের প্রতিটি ইঞ্চি চোখ দিয়ে জরিপ করে চললাম। কিছুক্ষণের মধ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে জিপসি আমাদের সামনে ও পিছনের রাস্তায় এসে জমায়েত হয়ে পড়লো। জিপসিগুলির সম্মিলিত কোলাহল এবং একটি নয়, দু দুটি বাঘ দেখার আকুল উন্মাদনা একটা বিশাল হুল্লোড়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে তুলেছিল। ড্রাইভার কে বললাম, রাস্তা একটু ফাঁকা পেলেই সামনের দিকে গাড়ি চালাতে।
একটা সুযোগ পাওয়ামাত্র ব্যাকগিয়ারে গাড়িটা নিয়ে উল্টোপথে নিপুনভাবে চালিয়ে ৩০০ ফুট দূরে একটা "t" এর মত রাস্তায় গাড়িটা নিয়ে গিয়ে দাঁড় করলো। কিছুক্ষণ পরে যখন সামনের গাড়িগুলো বার হয়ে গিয়ে রাস্তাটা ফাঁকা হয়ে গেল, আমাদের গাড়িটা সোজা চালিয়ে যেখানে আমরা প্রথমে দাঁড়িয়েছিলাম, সেখানে পৌঁছে দাঁড়িয়ে গেল। হঠাৎই গাইড ভদ্রমহিলা ইশারায় আমাদের ডানদিকে একটা আমবাগানের দিকে দেখালেন, একটা হলুদ রঙের চলমান শরীর একঝলক চোখে দেখলাম, জন্তুটি একটু ফাঁকা জায়গায় আসতে বুঝতে পারলাম চলমান শরীরটা বাঘের। বাঘটা কোনো শব্দ না করে আমবাগানটার মধ্যে দিয়ে ধীর গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। ড্রাইভার আবার গাড়ি না ঘুরিয়ে ব্যাক গিয়ারে গাড়ি পিছিয়ে নিয়ে পুনরায় ওই " t " আকৃতির রাস্তায় এসে ইঞ্জিন বন্ধ করে বসে রইলো। কিছুক্ষনের মধ্যে সামনে একটা জিপসি উদভ্রান্তের মত ছুটে আসতে দেখা গেল। তাকে জিজ্ঞাসা করায় সে বলল সামনের আমবাগানে টাইগার এসেছে। পিছনে বহুত ভিড়। ওদিকে একটা লেপার্ড দেখা গেছে। সে লেপার্ড দেখেছে কি না জিজ্ঞাসা করায় তার উত্তরে সে মাথা নেড়ে না বলল। আমরা "t" এর মাথার কাছটায় অপেক্ষায় বসে থাকলাম। আরো ৫-৬ টা জিপসি টাইগার দেখতে দৌড়ে আসছিলো, জায়গাটা একটু ফাঁকা হয়েছে ভেবে আমরা সামনের দিকে এগোতে থাকলাম। সামনে চলার সময়ে আমাদের দুদিকের ফাঁকা জমি ক্রমশ জঙ্গলে পরিণত হতে শুরু করল।
আমাদের ১০০ মিটার সামনে কয়েকটা জিপসি রাস্তাজুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, গাইডের জিজ্ঞাসায় তারা জানাল সামনে একটা চিতা আছে, যেটা জঙ্গলের ভেতরে বসে রয়েছে, লোকজন ও চেঁচামেচি র জন্য বাইরে বেরাতে চাইছে না । খুবই স্বাভাবিক, প্রথমত এতো মানুষের সোৎসাহে অপেক্ষায় ভিড় করা, তার ওপরে এলাকাটায় দুদিক দিয়ে দুটি বাঘের চলতে চলতে এগিয়ে আসা, এই ব্যাপারগুলো লেপার্ড টার বিন্দুমাত্র পছন্দ হয়নি। জিপসি গুলো জায়গা থেকে সরে আসার কোনো ইচ্ছে না দেখানোয় আমি একটা গাম্বালিং করলাম। ড্রাইভার কে বললাম, সামনে থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে এনে বেরিয়ে যাবো বলে ফাঁকা জায়গা করো। এগোও, তারপর কপালে চিতা দেখা থাকলে ঠিক দেখে নেবো। ড্রাইভার আগের একটা গাড়িকে বলে কয়ে কোনোভাবে একটু জায়গা বার করে গাড়িটা সামনের রাস্তা বরাবর সোজা ১০০ মিটার এগিয়ে একটা চওড়া জায়গায় এসে গাড়িটা ঘোরাতে গেল, আর সাথে সাথে আমাদের সবাইকার চোখ গেল বাঁদিকের রাস্তাটা থেকে ২০ ফুট দূরে একটা সেগুন গাছের সোজাসুজি চ্যাটালো, ৩ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট পাথরটার দিকে। চিতাটা ঝোপঝাড় পেরিয়ে নিঃশ্বব্দে লোকচক্ষুর আড়ালে এসে এই পাথরটার ওপরে বসে রয়েছে, এদিক ওদিক ঘুরে দেখছে,, আর চিন্তা করছে, রাস্তা পেরিয়ে জঙ্গলের এ পাশটায় চলে আসবে নাকি ঐদিকে বনের আরো গভীরে ঢুকে পড়বে ? কারণ এলাকায় বাঘের উপস্থিতি তার অস্বস্তির কারণ হিসাবে তাকে সতর্ক করে তুলেছিল। আমরা যথেচ্ছ ছবি তুলে ও প্রাণভরে দেখার সময়ে পিছনের গাড়িগুলি আমাদের মনোরঞ্জনের আন্দাজ পেয়ে পক্ষীরাজের মত দৌড়ে আসতে শুরু করায় আমরা ধাক্কাধাক্কি থেকে বাঁচতে গাড়ি পিছনদিকে আর না ঘুরিয়ে সোজা সামনের দিকে চালিয়ে পার্কের বাইরের দিকে চলতে থাকলাম।

Rik Chowdhury কে বললাম, "Thanks to God, for your WISH FULFILLMENT".

ক্রমশ....

Photos from XNAT - Explore the Nature's post 02/03/2026

পেঞ্চের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অঢেল ভান্ডার ---
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
পর্ব ২ --> ৩/১/২০২৬
---****----

আজ খাওয়াসায় বাফার জোনের সকালের সাফারির পরে জিপসি থেকে রেস্ট হাউসে নেমে কিচেনে চায়ের সন্ধানে ঢুকলাম। দেবেন্দ্র প্রাতরাশ করছিলো, সাফারি কেমন হলো জিজ্ঞাসা করায় লেপার্ড দেখেছি কি না জিজ্ঞাসা করল, ঋক শান্ত ভাবে না বলায় বুঝলাম ও মনে মনে একটু রেগেছে। আমরা রুমে আসার পরে ও বলল আমরা লেপার্ড দেখেছি কি না ও কাল থেকে জিজ্ঞাসা করে চলেছে! আমরা সেই টাডোবায় আগারজারী থেকে লেপার্ড দেখবো বলে হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছি, ও কি ভাবছে, লেপার্ড দেখা আর চিতল হরিণ দেখা একই effort দেওয়ার ব্যাপার? আমি বললাম, ধৈর্য রাখ, পেঞ্চ এই লেপার্ড দেখবি, তবে আজকে সম্বরের দলটার মুভমেন্ট অনবদ্য ছিল। বহুদিন মনে থাকবে।
টুরিয়া থেকে খাওয়াসা প্রায় ১১-১২ কিমি দূরে। হাইওয়ের কাছে এই গেট। সকালে যখন বেরিয়েছিলাম তখন কুয়াশা ঘেরা প্রায়ান্ধকার পরিবেশে আপাদমস্তক মুড়ে গেটে ঢোকার পরপরই একটা বনমুরগির দলের দেখা পাওয়া গেল। দলটায় ৮/১০ টা মুরগি এবং ২ টি মোরগ আছে, মুরগিগুলো ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে মাটি থেকে খুঁটে খুঁটে খাবার খাচ্ছিলো, আর পুরুষ দুটি গলার পালক ফুলিয়ে উচ্চস্বরে ঝগড়া করে চলেছিল। দূর থেকে দৌড়ে এসে ঝটাপটি করে মারপিট করে আবার দূরে গিয়ে দৌড়ে আসছিলো, এইভাবে দলের কর্তৃত্ব দখলের জন্য যুদ্ধ দেখতেও খুব ভালো লাগছিল। মুরগিগুলোর অনেক পিছনে, প্রায় ২০০ মিটার দূরে দু তিনটি ময়ূর ও মাথা নিচু করে খুঁটে খুঁটে মাটি থেকে বীজ বা ছোট দানা, পোকামাকড় খেয়ে চলেছিল। আমরা কিছুক্ষণ পক্ষীকুলের প্রাতকালীন এই কার্যকলাপ মুগ্ধতার সঙ্গে দেখার পরে জিপসি এগিয়ে চলল। জিপসি আরো খানিকটা এগোতে একটা চিতলের ঝাঁক দেখলাম, লক্ষ্য করলাম দলটিতে বেশিরভাগ পুরুষ হরিণের সিঙ গুলো রবারের মত ও রোয়া ওঠা। ঋক কে বললাম এই সিঙ গুলো প্রথমে cartilage, fibrous tissue, সাথে blood vessel ও nerve দিয়ে তৈরী, চামড়া ঢাকা থাকে, এগুলো androgen হরমোনের development ঘটিয়ে বাড়তে থাকে, প্রাক শীতে এগুলো শক্ত হাড়ের ন্যায় keratin এ পরিণত হয়। এরা এই সিঙ গুলো গাছের গায়ে ধাক্কা মেরে মেরে ভেঙে ফেলে, যা আবার কিছুদিন পরে নতুনভাবে গজিয়ে ওঠে। প্রজনন ঋতু শেষ হলে এরা সিঙগুলো নিজেরাই ভেঙে ফেলে। কারণ সিঙ গুলো স্ত্রী প্রজাতিকে সংগমের জন্য আকর্ষণ, দলের অন্য পুরুষকে যুদ্ধে হারিয়ে কোনো স্ত্রী হরিণকে পাওয়ার জন্য, হায়না, শিয়াল বা নেকড়ের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করে থাকে।
রাস্তার ধারে ঝাঁক বেঁধে বানরের (Macacue) দল বসে ঠান্ডায় হি হি করে কাঁপছিল, বাচ্ছাগুলো মানুষের বাচ্ছাদের মতো তাদের মায়ের কোলের উষ্ণতায় সেঁধিয়ে বসেছিল।
আর জিপসিগুলোর দিকে কিছু খাবারের আশায় তাকিয়ে দেখছিলো। গাইড বলল, কেউ খাবার দিলে spot fine ১০০০০/- এবং সাথে সাথে তার সাফারি বাতিল। এটা করতে বনদপ্তরের তরফে গাইডদের অলিখিত অনুমতি দেওয়া থাকে। আরো এগোতে, একটা নীলগাই এর দলের দেখা মিললো। একসময়ের অফুরান সংখ্যার এই প্রাণীটিকে আজ বেশ কষ্ট করে খুঁজে দেখতে হয়। পুরুষের গায়ের রঙ নীলচে, স্ত্রী দের বাদামি বর্ণ। বেশ বড়ো আকারের, যদিও গাই বলা হয় তবু এরা গরু গোত্রীয় নয়, ঘোড়া বা হরিণ গোত্রীয়। জিপসি কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতে কিছুক্ষণ সন্দীগ্ধ ভাবে দেখার পরে দৌড়ে রাস্তা পেরিয়ে জঙ্গলের গভীরে ঢুকে পড়লো। জিপসি ও সামনের দিকে এগিয়ে একটা বড়ো তালাও (লেক ) এর সামনে এসে দাঁড়ালো।
এবারে পেঞ্চ ন্যাশনাল পার্কের একটা বিবরণ জানানো দরকার। পার্ক টির পূর্বে খাওয়াসা ও দক্ষিণে চোড়বাহুলী দুটি বাফার গেট। উত্তরে কর্মাঝিরি ও জামতারা দুটি কোর গেট, এবং পার্কটির ঠিক মাঝে বিখ্যাত টুরিয়া গেট। এই যে লেক টার উল্লেখ করলাম, এর নাম জুনেয়ানি লেক। লেক টিতে এই শীতেও যথেষ্ট জল আছে, দুটি শুকনো গাছ লেক টির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে, যা কোনোদিন লেক টির ওপরেই ভুপাতিত হয়ে সলিল সমাধি প্রাপ্ত হবে। আমাদের সামনে একটা গাছের ডালে একটা পানকৌরি (Little Indian Cormorant ) বসে তার ডানা গুলো শুকিয়ে নিচ্ছে। এই পাখিগুলো জলের পার্শ্ববর্তী কোনো গাছের ডালে বসে ভিজে ডানা গুলো পর্যায়ক্রমে খুলে ও বন্ধ করে শুকিয়ে নিতে থাকে। বাঁদিকে আরেকটি গাছে একটা নীলরঙা মাছরাঙা ( common kingfisher ) চুপ করে বসে আছে, বেচারি এই শীতে শিকার ধরতে জলে নামতে চাইছে না বলে মনে হলো। জিপসি আরেকটু এগিয়ে একটা নালার সামনে দাঁড়ালো, গাইড ওপরদিকে আঙ্গুল তুলে নালার ডানদিকে একটা সেগুনগাছের মগডালে বসে থাকা crested serpent eagle এর দিকে দেখাল, বাদামি রঙের পাখিটা ও আমাদের তীক্ষ্ণ ভাবে পর্যবেক্ষণ করে চলেছিল। আমরা তার শান্তিপূর্ণ বিশ্রামের বিঘ্ন না ঘটিয়ে সামনে ৩০০ মিটার দূরের breakfast point এর দিকে জিপসি এগিয়ে চললাম। এখানে এক দম্পতি একটা ঝুপড়িতে breakfast এর আয়োজন করে থাকেন। আমাদের জন্য রেস্ট হাউস থেকে দেওয়া breakfast এর তোরঙ্গ জিপসির বনেটের ওপর সাজিয়ে রেখে তা পরিবেশন করা হলো। ঝুপড়ি থেকে চা আনা হলো, খিদের মুখে গোগ্রাসে খেয়ে নিয়ে ও refreshed হয়ে আমরা জিপসিতে উঠলাম।
জিপসি এবার জঙ্গলের পূর্বদিকে এগিয়ে একটা সরু পায়ে চলা পথে ঢুকে পড়লো। প্রায় ১ কিমি পথ এগোনোর পরে আমাদের ডানদিকে একটা পাহাড়ের ঢাল যেখানে একটা রাস্তায় এসে মিশেছে, এই জায়গাটাতে রাস্তার বাঁদিকে একটা সরু খাল ও তার পাশে একটা নাবাল জমি চোখে পড়লো। ওই নিচু জমিটায় সেগুন, অর্জুন, জাম ও মহুয়াগাছের বেশ বড়ো বন। আর গাছগুলোর নিচে যথেচ্ছ ঘাসের সমাহারে জায়গাটা তৃণভোজি জন্তুদের জন্য এক স্বর্গীয় উদ্যান। এই জায়গাটাতে পৌঁছে আমরা জিপসির স্টার্ট বন্ধ করে ঢাল বরাবর এগিয়ে চললাম। কারণ আমাদের সামনে ১০০ মিটার দূরে দাঁড়ানো একটা জিপসিতে এক পরিবার বাঁদিকে মনোযোগ সহকারে তাকিয়ে কিছু দেখে চলেছে। একজন ষাট বর্ষিয় ব্যক্তি একটা ঢাউস ক্যামেরা নিয়ে একমনে ছবি তুলে চলেছেন। পাশে সম্ভবত তার মেয়ে, তার কানে ফিসফিস করে কিছু বলে চলেছেন। আমরা একদম ওদের জিপসিটার পিছনে পৌঁছে বাঁপাশের নাবাল জমিটাতে একটা সম্বরের দলকে চড়তে দেখলাম। দলটিতে ১০/১২ টা সম্বর দেখা যাচ্ছে, এরমধ্যে একটি বিশালকায় পুরুষ সম্বর, যার ওজন কমপক্ষে ৪৫০ কেজি হবেই, পেশীবহুল শরীর ও ঘাড়ের ঝাঁকড়া রোম গুলো তার পুরুষাকারের গর্বকে প্রতিষ্ঠা দিচ্ছে। বিশাল সিঙাল পেশীবহুল এই জন্তুটি সামনের জিপসি দুটোর উপস্থিতি অগ্রাহ্য করে একটা মহুয়াগাছের শক্ত বাকলের ওপরে তার সিঙ দুটি জোরালো ভাবে ঘষে চলেছে। প্রথমে মনে হয়েছিল সিঙে কাদা বা আগাছা লেগে থাকায় তা পরিষ্কার করে চলেছে, হঠাৎই মাথায় এলো এই সময় হরিণ গোত্রীয় প্রাণীগুলি তাদের antler খসিয়ে নতুনভাবে প্রজননে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং এতগুলো স্ত্রী সম্বরের একমাত্র পুরুষ সঙ্গী হিসাবে এও শরীরে androgen হরমোনের আধিক্য নিয়ন্ত্রণে এই কাজটি করে চলেছে। কিছুক্ষণ সিঙ গুলি ঘষার পরে সে তার পিছনদিকে ঘুরে গিয়ে, আমাদের সামান্তরাল ভাবে চলতে শুরু করলো, আর দলটাও তার সাথে চলা শুরু করলো।
সামনের জিপসিটা তখনও দাঁড়িয়ে, আমি ড্রাইভার কে ইশারায় এগোতে বলে ঋক কে ওদের হাঁটার ছবি এক টানা ভাবে তুলে যেতে বললাম। ড্রাইভার ও ব্যাপারটা বুঝতে পেরে জিপসি টা গড়িয়ে গড়িয়ে চালাতে শুরু করল। হঠাৎই পুরুষ সম্বরটা দাঁড়িয়ে পরে হরমোনের প্রাবল্যচ্ছাসে দগ্ধ হয়ে তার বর্ধিত শারীরিক চাহিদার নির্মোচনের তাড়নায় সামনে থাকা একটা সেগুনগাছের কান্ডকে সামনের পা দুটির সাহায্যে জড়িয়ে সোজা হয়ে মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে তার গা ঘষে চলল। প্রায় মিনিট দুই এভাবে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সে আবার মাটির ওপর স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল। আর আমরাও পাশাপাশি চলতে থাকলাম। আন্দাজ ২০ ফুট দূরে নাবাল জমিটা ক্রমশ ঢালু হতে হতে একটা খালে গিয়ে শেষ হয়েছে। সম্বরের দলটা খালের সামনে এসে এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে থেকে খালে নেমে পড়লো এবং কয়েকটি সম্বর জল খেতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। আমরাও খাল বরাবর রাস্তাটার ঢালাই করা ব্রিজে বয়ে চলা স্বল্প জলের ওপর জিপসিতে বসে দলটির জলে নামা, জল খাওয়া ও উল্টোদিকের পাড়ে উঠে পড়া দেখতে লাগলাম। সম্পূর্ণ দলটি জল থেকে উঠে বাঁদিকে গভীর বনে ঢুকে গেল। তৃণভোজি প্রাণীদের প্রজনন কালীন আচরণ ও মানসিক ব্যবহারের ওপরে বেশ কয়েকটা ডকুমেন্টরী ভিডিও প্ৰখ্যাত প্রাণী চ্যানেল গুলিতে দেখেছি, বিশেষত ডেভিড অ্যাটেনবড়ো র ভিডিও আমাকে অভিভূত করে থাকলেও চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার অনুভূতি ভাষায় বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই।
এক তুরীয় আনন্দে ভাসতে ভাসতে আমরা রেস্ট হাউসে ফিরলাম, ক্যান্টিনে চা খেতে খেতে দেবেন্দ্রর মুখে শুনলাম মি: চৌহান আমার গতকালের night safari টা না হওয়ার খবর পেয়ে আজ পূর্ণিমার রাতে তার নিজস্ব মাচানে আমাদের বসার জন্য বন্দোবস্ত করতে বলে রেখেছেন। আমি দেবেন্দ্রর সাথে করমর্দন করে বিশ্রামের খোঁজে ঋক কে নিয়ে রুমের দিকে হাঁটা দিলাম।

ক্রমশ.....

02/03/2026

পেঞ্চের নাটকীয়তা ---***---->
~~~~~~~~~~~~~

১ম পর্ব- ২/১/২৬
B২ র প্রেম কাহিনী -

নাগপুর থেকে জব্বলপুর যাওয়ার রাস্তাটায় খাওয়াসা মোড়ে পৌঁছে বাঁদিকে গাড়িটা ঘুরে একটা বনপথ ধরে ৭-৮ কিমি রাস্তা এগিয়ে চলল। সর্পিল রাস্তাটি DFO অফিসের পাশ দিয়ে আরো কিছুটা এগোনোর পরে গ্রামের রাস্তা শুরু হল। দুধারে মাঠজুড়ে কেটে নেওয়া ধানগাছের গোড়াগুলি ঝকঝকে রোদে সোনালী দ্যুতি ছড়াচ্ছিল। মাঠ পেরিয়ে একটা রাস্তা জুড়ে নির্মিত গেরুয়া রঙা তোরণ। তারপরে গ্রামের শুরু এবং আরো ২ কিমি গিয়ে আমাদের রেস্ট হাউস। প্রবেশের শুরুতেই উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে ম্যানেজার মিঃ চৌহান ও তার সহকারী দেবেন্দ্র এগিয়ে এলেন। আমাদের ঘরটা রেস্ট হাউসের একদম শেষে নির্জন পরিবেশে, লোহার তারজালির বাউন্ডারির পাশে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা কোয়ার্টার। ভালোই হয়েছে, এখান থেকে ক্যান্টিন অনেক দূরে হওয়ায়, চা কফি খেতে বারবার দৌড়াতে হবেনা ভেবে খুশি হলাম।
বিগত কয়েকদিন মাত্রাতিরিক্ত ভ্রমণের ক্লান্তি চেপে বসলেও বিকালের সাফারির জন্য দ্রুত তৈরী হতে গিয়েও দেরি হয়ে গেল। খেতে বসে শুনলাম জিপসি এসে গেছে, দ্রুততার সাথে খাওয়া শেষ করে জিপসিতে বসে ঘড়িতে দেখলাম ১৫ মিনিট লেট। ড্রাইভার গাড়ি উড়িয়ে নিয়ে ১০ কিমি রাস্তায় এগিয়ে চলল। কিছুদূর গিয়ে ডানদিকে ঘুরে একটা সরু মেঠো রাস্তায় পরে, একদিকে জঙ্গল ও আরেকদিকে গ্রামকে বিভাজিত করে গাড়ি একটা বন্ধুর পথে লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে থাকলো। গ্রামের বাইরের দিকে গোশালা, যা এখন প্রায় খালি, বেশিরভাগ ই চড়াতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গোশালা পেরিয়ে একটা আগাছায় তৈরী গেট টপকে গ্রামের মধ্যে দিয়ে শর্টকাট মেরে একেবারে জঙ্গলের সামনে জিপসি পৌঁছলো এবং ডানদিকে ঘুরেই দেখতে পেলাম সুসজ্জিত খুর্সাপার গেট। এটি পেঞ্চের মহারাষ্ট্র রাজ্যের মধ্যে পড়ে। আমরা যেমন পেঞ্চের মধ্যপ্রদেশ অঞ্চলে রয়েছি, এখানে সাফারিতে এসেছি।
গাড়ি গেটে প্রবেশের আগে পার্মিট সংক্রান্ত কাগজ লেনদেন করে ঢোকার সময় দেখলাম আমরা ২৫ মিনিট দেরিতে ঢুকলাম। কিছুদূর যাওয়ার পরে ঋক বলল,"Look Jackel". আমি বয়ে আসা জোরালো উত্তরে হাওয়ার বাধা কাটিয়ে একটু জোরেই বলে ফেললাম, "Don't stop. Go ahead, there is something attracting me". আমার কথায় ড্রাইভার দ্রুত সামনে গাড়ি ছোটালো। গাড়িটা মিনিট কুড়ি চলার পরে হঠাৎ আমাদের সামনে ৩০০ মিটার দূরত্বে একটা জিপসি দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম, দুজন ভদ্রলোক , সাথে তিনজন গাইড "t" আকৃতির রাস্তায়, আমাদের ডানদিকে তাকিয়ে রয়েছেন। আমাদের গাড়িটা দুর থেকে আসতে দেখে তারা ইশারায় ইঞ্জিন বন্ধ করতে বলল। আমাদের গাড়িটা নিঃশ্বব্দে জিপসিটার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো। গাইড জানাল, এই অরণ্যে জিপিএস দ্বারা গাইড করা হয়না, এখানে জঙ্গলের বিভিন্ন কল এর ওপরে নির্ভর করে সাফারি করা হয়। আমার মনে হলো এই পদ্ধতি আধুনিক না হলেও এতে নিবিড়ভাবে প্রকৃতিকে উপভোগ করা যায়।আমরাও তাই ইন্দ্রিয়য়গুলি অতিমাত্রায় সজাগ রেখে সিটে বসে পড়লাম। প্রায় ৭/৮ মিনিট নিশ্চলভাবে বসে আছি, হঠাৎ অনুভব করলাম কোনো পাখি বা পশুর এতটুকু শব্দ নেই, জঙ্গল যেন রাতের শোবার ঘরের মতো শান্ত ও নিস্তব্ধ । হঠাৎই আমাদের সামনের দিকে আধমাইল দূরে একটা চিতল হরিণের ভয়ার্ত ডাক শুনলাম, যে ডাক ক্রমশ বাঁ পাশের উপত্যকা থেকে উপরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। ডাকগুলি শেষ হওয়ার পরে ২ মিনিটের একটা নিস্তব্ধতা, আর তারপরেই সেই পরিচিত গুরুগম্ভীর ডাক " ওয়া.. ঘ ", যা টাডোবার স্মৃতি উস্কে দিল। সামনের জিপসির পিছনে আমরা চলতে শুরু করলাম, রাস্তার ডানদিকে খানিকটা এগিয়ে জিপসি সমতলভূমি ছেড়ে পাহাড়ের দিকে উঠতে লাগলো, এবং বেশ খানিকটা ওঠার পরে একটা ৬০° কোণ করে থাকা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়লো। আমাদের বাঁদিকে সেগুনগাছের ঘন জঙ্গল, সাথে খয়ের, তুত, মহুয়া, আইন, জাম আর শাল গাছের আধিক্য। গাছগুলির মাঝে লম্বা হলুদরঙা ঘাসে ঢাকা প্রান্তর। জঙ্গলে ভয়ঙ্কর একটা অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা ছেয়ে রয়েছে। হঠাৎ প্রায় ৫০ ফুট দূরে, বাঁদিকে একটানা তিনবার বাঘের জোরালো ডাক। আবার নিস্তব্ধতা। আচমকা হরিণের দলের আমাদের ১০০ মিটার দূরের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এক অদৃশ্য দৌড়ের শব্দ। দুটো ম্যাগপাই এর কিচির মিচির সতর্কবানী। আর, মনে মনে আমার এক থেকে দশ অবধি গোনা শেষ হওয়া মাত্র উপত্যকার দিকের একটা ঝোপের মধ্যে থেকে আমাদের থেকে ৩০ ফুট দূরে বাঁদিক দিয়ে বেরিয়ে এলো একটা বাঘের মাথা। সামনের দিকে এগোতে এগোতে ২ টো ডাক দিয়ে সে স্বমহিমা প্রকাশ করলো। পূর্নবয়স্ক এক বাঘিনী, গায়ের চামড়া উজ্জ্বলতা পূর্ণ। বাঘিনী কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে আমাদের ডানদিকে পাহাড় বরাবর উঠতে শুরু করলো। সাথে সাথে অতি দ্রুততার সঙ্গে আমাদের জিপসি ঘুরে গিয়ে পিছনদিকে ছুটতে শুরু করলো। গাইড বলল, পাহাড়টি যেদিকে ঢাল বরাবর নেমে গিয়েছে, সেদিকে পৌঁছতে পারলে পুনরায় বাঘিনীর মুখোমুখি হওয়া যেতে পারে। ঢাল বরাবর নেমে দুটি পাহাড়ের মাঝে "U" আকৃতির গিরিখাতে জিপসি এসে দাঁড়িয়ে পড়লো, ড্রাইভার গাইডের দূরবীন নিয়ে এবং ঋক ক্যামেরা নিয়ে, আর আমি ও গাইড খালি চোখে আমাদের বাঁদিকে ওপর বরাবর দেখছি, এমন সময়ে বাঘিনীর পরপর দুবার গুরুগম্ভীর গর্জন উপত্যকা কাঁপিয়ে জানান দিল বাঘিনী পাহাড় থেকে নেমে আসছে। বাঘিনী নেমে এসে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আবার আমাদের ডানদিকের পাহাড়ে উঠে চলতে চলতে ক্রমশ আমাদের দৃশ্যপটের বাইরে মিলিয়ে গেলো। গাইড বলল, বাঘিনীর নাম B২, মাঝবয়সী, দুটি ২ বছর বয়সী শাবক আছে, যারা শিকার করতে শিখে গেছে ।
আমি ড্রাইভারকে গাড়ি স্টার্ট দিতে বললাম, কারণ বাঘিনী আজকে আর পাহাড় থেকে নেমে আসবে না।
জিপসি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে, আমরা সেই আগে থাকা জিপসি টি দেখতে পেলাম, জিপসিটা দাঁড় করিয়ে ভদ্রলোক ও গাইডেরা কিছু আলোচনা করছিলেন। আমরা গিয়ে পাশে দাঁড়াতে আমাদের সাথে সৌজন্য জ্ঞাপন করে আমরা কলকাতায় থাকি শুনে ওরা নাগপুরের বাসিন্দা বলে জানালেন, শুনলাম ওঁদের মাসে এক আধবার করে পেঞ্চে আসার থাকে। হঠাৎ ওঁদের জিপসিতে Nat Geo Wild এর লোগো টা চোখে পড়ায় ইঙ্গিতে তা দেখিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম।
ওঁদের আলোচনা অনুযায়ী বাঘিনী তার শাবক দের খুঁজে বেড়াতে ডেকে ডেকে চলছিল, এই যুক্তি আমার ঠিক মনে হয়নি বলাতে গাইড বলল আমার ধারণা ঠিক। কারণ এটা বাঘিনীর তার সঙ্গীকে খোঁজার জন্য ডাক বলে আমার মনে হয়েছিল। কারণ বাঘিনী যখন ডাকছিলো তখন সম্পূর্ণভাবে ফুসফুসে হাওয়া ভরে জোরালোভাবে ডেকে জঙ্গলের কোনো প্রান্তে সঙ্গীকে খুঁজে বেড়াছিল। আর টাডোবা তেই দেখেছি বাঘিনী তার বাচ্ছা কে খোঁজার সময় স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে এবং খুবই আস্তে আস্তে মোলায়েম স্বরে ডাকতে থাকে। গাইড, ড্রাইভার আর ঋক প্রত্যেকেই আমার হিন্দিতে বলে চলা এই তত্ত্ব বিশ্বাসের সঙ্গে শুনছিলো এবং সম্মতি জানাচ্ছিলো।
আমরা এরপর এমন একটা বনপথে এসে পড়লাম যেখানে রাস্তাটা খুবই বন্ধুর, জিপসি লাফিয়ে লাফিয়ে চলার দরুন কোমর ও পিঠে খুবই ব্যথা লাগছিলো, একটা বাঁকে গাড়িটা ঘুরতে বাঁদিকের একটা শেওড়া গাছের মগডালে দুটো হনুমান বসে আছে দেখলাম, ভাবলাম বেলা পড়ে আসছে, তাই হয়ত মাটিতে না নেমে গাছের ওপরে উঠে বসেছে। আমরা যেইমাত্র গাছটা পার করে এগিয়ে গিয়েছি পিছন থেকে হঠাৎই তাদেরকে বেশ ভয়ার্ত স্বরে খোঁক-খোঁক-খোকড়- খোঁ শব্দ করে ডাকতে শুনলাম। তারা এইভাবে ক্রমাগত ডাকতে থাকলো। মনে মনে ভাবছিলাম, আমাদের দেখে তো ডাকার কথা নয়, কারণ আমরা ওদেরকে ছেড়ে চলে আসার পরে ওরা ডাক শুরু করেছে, তাই কি দেখে ওরা ভয় পেল সেই প্রশ্নটা মনে রেখে এগিয়ে চললাম।
১০০-১৫০ মিটার এগোনোর পরে জিপসিটা চলতে চলতে থেমে গেলো, ড্রাইভার মাটির দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখালো, দেখলাম মাটিতে বাঘের শাবকের থাবার ছাপ। ছাপ গুলি একেবারে টাটকা, একটা জিপসির চাকার দাগের ওপরে সেগুলো যার পায়ের, সে এক মুহুর্ত আগেই এই স্থান টা অতিক্রম করে গিয়েছে। গাইড বলল এগুলো চিতার পায়ের ছাপ, চিতাটিকে হনূমান গুলো গাছের ওপর থেকে বসে দেখতে পেয়ে ডেকে চলেছিল, চিতাকে ওরা ভীষণ ভয় পায়কারণ চিতা গাছে অনায়াসে উঠে গিয়ে হনূমান দের মেরে ফেলতে পারে। চিতাটা আমরা আসার কয়েক মিনিট ও না কয়েক সেকেন্ড আগেই রাস্তায় উঠে এসে চলছিল, আমাদের গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দে জমিতে নেমে দ্রুত ঝোপে ঢুকে গিয়েছে। হয়তো কোনো ঝোপের আড়াল থেকে সে আমাদের দেখছে, কিন্ত আমরা তাকে শরীরের রঙের বৈচিত্রময় কামোফ্লাজের দরুন দেখতে পাচ্ছিনা।
সন্ধ্যা নামতে চলেছে, তাই চিতার উগ্র স্বভাবকে প্ররোচিত না করে আমরা পার্কের বাইরে বেরোনোর জন্য গাড়ি ছুটিয়ে দিলাম।

ক্রমশ..

Want your business to be the top-listed Government Service in KOLKATA?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Telephone

Website

Address


Priya Mitra Road
Kolkata
700048