16/08/2022
-- ভালো চেষ্টার কথা--
ঐকতান
চার দিকে শুধু চুরি আর চুরি। খবর মানেই টাকাচোর, গরুচোর, ভোটচোর, চোরে চোরে ছয়লাপ।
'এই মাত্র? আর কিছু নয়?' গত দু' বছরে আমরা কয়েকজন একটা কাজে অংশগ্রহণের চেষ্টা করছি। গণমাধ্যমে সেই যে একটা মেসেজ ঘুরছিল না, 'যদি আর্থিক অসুবিধে থাকে, আমাকে ইনবক্স করুন, আমি যা আছে, তা দিয়েই.....', সেটা থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু। বলা বাহুল্য, কেউ মেসেজ করেনি। যার খাদ্যাভাব, সে কি ফেসবুক করে? তখন ভাবনা শুরু হল একসাথে কিছু একটা করার। বিভিন্ন কলেজের বেশ কিছু শিক্ষক-ছাত্র মিলে তৈরি হল একটা দল। নাম হল 'ঐকতান'। না, সংগঠন নয়, রেজিস্টার্ড কোন কমিটি নয়। একেকজন একেক জায়গায় থাকি, যোগাযোগের অসুবিধে, অর্থ তহবিল গঠনের সমস্যা আছে। ছাত্রদের রোজগার নেই, তারা কতটুকু দিতে পারবে? তা ছাড়া 'লোকের জন্য করব' ব'লে ঝোঁকের বশে রাস্তায় নেমে অনভিজ্ঞ ছুটোছুটিই সার, কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাই ঠিক হল, কোথাও সাহায্যের দরকার পড়লে আমাদের সাধ্যের মধ্যে যা পারব, কোন নথিভুক্ত বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে পাঠাব। ঠিক হল, আমাদের টাকা সংগ্রহ নিজেদের মধ্যেই এবং ঐচ্ছিক থাকবে। যা পারব, করব; আমাদের হাতে ভুবনের ভার নেই। যে যা পারলাম, টাকা ফেলতে লাগলাম। কর্মহীনতা, দারিদ্র্য, পড়াশুনোর খরচ, অসুস্থতা ইত্যাদি পরিস্থিতির কিছু কিছু আবেদন আসতে লাগল, যথাসম্ভব কিছু পাঠানো হল।
এখানে দু'টো বিষয় উল্লেখ্য। ঐকতান তৈরিতে সবার ভূমিকা সমপর্যায়ের নয়। কেউ তহবিল সামলায়, তো আর কেউ পরিকল্পনা এবং পরিচালনায় বেশি অংশগ্রহণ করে। কেউ সুপরামর্শ বেশি দেয়, আবার কেউ বা বেশি টাকা দেয়। অন্য কেউ খবর আনে কোথাও সাহায্য দরকার। অনেকে ঐকতানের কথা প্রচার করে। কোন কাজ ভাগ করা নেই, সবটাই ঐচ্ছিক। যে পরিকল্পনা বেশি করে, সে হয় তো এক দিন কোন দরিদ্রনারায়ণের খোঁজ আনল। যে পরামর্শ বেশি দেয়, সে হয় তো কখনও তহবিলের কোন কাজ করল। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেই আলোচনা, পরামর্শ হয়ে যায়। আমরা অনথিভুক্ত, অসংগঠিত দল ঐকতানের ঐচ্ছিক সদস্য। আলাদা মিটিং হয় না, একটা পরিবার হিসাবে আছি। তাই কারুরই নাম উল্লেখ করছি না। সবটা সবার। দুই, ঐকতানের সদস্যরা ব্যক্তিগত স্তরে সমাজের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেন। সেটা যার যার ব্যাপার, আমরা কেউ সবারটা জানতে পারি না। প্রচার করাও হয় না।
লকডাউনের শেষ পর্যায়ে আমাদের কাছে সাহায্যের আবেদন ক'মে এসেছিল। তখন মনে হল, একটা অবৈতনিক কোচিং সেন্টার খুললে কেমন হয়? ঠিক হল সুন্দরবন তীরবর্তী অঞ্চলের দয়াপুরে কাজ শুরু হবে। পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণীর মেধাবী অথচ আর্থিক দিক থেকে অনগ্রসর কিছু ছাত্রছাত্রীকে রোজ সন্ধ্যায় পড়াতে রাজি হলেন স্থানীয় দুই শিক্ষক, অতিসামান্য সম্মানদক্ষিণার পরিবর্তে। লোকমাতার জীবনোৎসর্গকে মাথায় রেখে নাম দেওয়া হল 'নিবেদিতা ফ্রি কোচিং সেন্টার'। জানেন, সাড়াও পাওয়া গেল যথেষ্ট! সরকারি স্কুলে সব ছেলেমেয়েরাই শুধু মিড-ডে-মিলের জন্য যায় না, পড়তেও যায়। নিবেদিতা ফ্রি কোচিং-এ পয়সা দিতে হয় না, তাই উশুল করারও কিছু নেই, তবু গ্রামের ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। এলাকার বাসিন্দারাই পড়ার ঘরের ব্যবস্থা করেছেন। পিঠে ব্যাগ নিয়ে বাচ্চারা আসে একফালি ঘরে, তাদের সঙ্গে মেঝেতে বসেই শিক্ষকেরা পড়ান। বস্তুগত লাভের আশায় নয়, পড়তেই আসে ওরা। যার যা প্রয়োজন, সব বিষয়ই পড়ান দুই শিক্ষক। মোটা মাইনে নেই, নগণ্য সাম্মানিকেই ওঁরা নিজেদের উজাড় ক'রে দেন। এতটা আমরাও আশা করিনি। ওইটুকু কোচিং সেন্টার এবার স্বাধীনতা দিবস পর্যন্ত পালন ক'রে ফেলল। আমরা আশান্বিত; পরবর্তী কালে কাকদ্বীপে অনুরূপ একটা কর্মকাণ্ডের ভাবনা আছে আমাদের। যদি পারি, পরে হয় তো এ রকম বা আর কোন রকম উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবব।
খুব বেশি কিছু করতে পারে না ঐকতান। ফান্ড কম, ছুটি ছাড়া নিজেদের নড়াচড়া মুশকিল, তা ছাড়া সবারই কাজের চাপ, পরিবারের চাপ। তাও স্বল্প সঞ্চয়ে কাছেদূরে কিছু প্রয়াস চলছে। দেশবিদেশে অনেক খারাপ কাজ হয়, শিরোনামে সেগুলোই থাকে। আবার পৃথিবী জুড়ে অনেক ভালো কাজও হয়, তার প্রচার অনেক কম। 'ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া' ছোটবড় এমন বহু উদ্যোগ দেখতে পাবেন। সেগুলোও জানুন। ঐকতান বড় সংস্থা নয়, ছোটখাট কিছু কাজে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আপনারা প্রার্থনা করুন, তার মধ্যেই এই রকম একটা-দু'টো কাজ যেন চলতে থাকে।

22/01/2022
07/10/2021