আজ সাধনাশ্রম এর ১৩২তম প্রতিষ্ঠা দিবস।
সময়টা উনিশ শতকের অন্তিম দশকের প্রথম দিক। ব্রাহ্ম সমাজের কাজ তাঁকে আর তৃপ্ত করছিল না। তাঁর সমস্ত দেহ, মন ও প্রাণ তখন পরমেশ্বরের চরণে সর্বস্ব সমর্পণ করতে প্রস্তুত হচ্ছিল। তবে তিনি এও উপলব্ধি করেছিলেন, এই সাধন পথে শুধু নিজেকেই ব্যাপৃত রাখলে চলবে না। একদল যুবক চাই যাঁরা ব্রাহ্ম আদর্শকে বুকে ধারণ করে এই আধ্যাত্মিক সাধন-মার্গকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তিনি অর্থাৎ শিবনাথ শাস্ত্রী।
১৮৯২ সালে মঘোৎসবের সময় শিবনাথ শাস্ত্রী এবিষয় আলোচনা করেন খাসিয়া পাহাড়ের কিংবদন্তি প্রচারক নীলমণি চক্রবর্তী ও সিটি কলেজের অধ্যক্ষ উমেশচন্দ্র দত্তের সঙ্গে। তাঁর উদ্দেশ্য পরিস্ফুট হল মাঘোৎসবের প্রভাতকালিন উপাসনায়।বিষয়ের শিরোনাম: 'ঈশ্বর বিশ্বাসী ও প্রেমিক জনকে আপনার কাছে রাখিয়াছেন'। অতঃপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৮৯২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর ঈপ্সিত লক্ষের প্রতি প্রথম পদক্ষেপ করলেন সাধন-আশ্রম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। গড়ে তুললেন ব্রাহ্ম কর্মী মণ্ডলী, 'ব্রাহ্ম ওয়াকার্স গ্রুপ'।
সাধন আশ্রমের লক্ষ্য প্রথমেই পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছিল:
যাঁহারা বিষয় কর্ম ত্যাগ করিয়া ব্রাহ্ম ধর্ম সাধন, ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচার ও ব্রাহ্ম সমাজের সেবাতে সমুদয় দেহ মন জীবন নিয়োগ করতে ইচ্ছুক, তাঁহাদের একত্র বাস, একত্র সাধন ও একত্র কর্ম করিবার ব্যবস্থা করিয়া একটি ব্রাহ্ম সাধক দল গঠন করা ইহার উদ্দেশ্য।
তবে সাধন আশ্রমের কর্ম শুধু কলকাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তৎকালীন অখণ্ড ভারতের বিহারের বাঁকিপুর, লাহোর, ঢাকা, এলাহাবাদ, বাংলার উলুবেড়িয়ার সন্নিকটস্থ বাণীবন, কলকাতার উপকণ্ঠে আড়িয়াদহে সাধন আশ্রমের শাখা স্থাপিত হয়।
সেবা কাজ এই প্রতিষ্ঠানের মুখ্য উপজীব্য ছিল। এর দ্বারা পরিচালিত সেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে 'বাংলা ও আসামের অনুন্নত শ্রেণির উন্নতি বিধায়িনী সমিতি', 'ঢাকা হিন্দু বিধবা আশ্রম', 'রামমোহন রায় সেমিনারি' পাটনা, 'হাজারীবাগ দাতব্য চিকিৎসালয়' সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠানের কৃতিত্ব বিচার-বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই বলতে হয়, সাধন আশ্রম এমন কয়েকজন আচার্য পেয়েছিল যেমন হেমচন্দ্র সরকার, অমৃতলাল গুপ্ত, সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী, নবদ্বীপচন্দ্র দাস, আদিনাথ চট্টোপাধ্যায়, মনোমোহন চক্রবর্তী, কাশীচন্দ্র ঘোষাল প্রমুখ যাঁরা শুধু ব্রাহ্ম সাহিত্যকেই সমৃদ্ধ করেননি, বা ব্রাহ্ম আন্দোলনকেই অগ্রসর করেননি, নিজের পূত জীবন ও ব্যক্তি মাধুর্যে সাধন আশ্রমের আদর্শ ও উদ্দেশ্যকেও প্রতিফলিত করেছেন।
Sadhanasram S.B.S
Ekamevadwitiyam
আজ ৭ পৌষ
আঁধারে আলো আবিল করে
আঁখি যে মরে লাজে,
তোমার বাণী কখনো শুনি কখনো শুনি না যে॥
ব্রাহ্ম সমাজের ইতিহাসে ও বাংলার নবজাগৃতি ('রেনেসাঁ' অর্থে নয়)-র প্রেক্ষিতে আজ, বাংলা ৭ই পৌষের তাৎপর্য অপরিসীম। ১২৫০ বঙ্গাব্দে(১৮৪৩ খ্রি.) আজকের দিনেই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর 'বেদান্ত প্রতিপাদ্য সত্যধর্মে' (যা পরবর্তীকালে 'ব্রাহ্ম ধর্ম' নামে সুপরিচিত হয়) দীক্ষালাভের দিন। মহর্ষির প্রামাণিক জীবনীকার অজিতকুমার চক্রবর্তীর কলমে:
সমাজের যে নিভৃত কুঠুরিতে বেদপাঠ হইত, তাহা একটি পর্দা দিয়া ঢাকা হইলো। সেখানে একটি বেদী স্থাপিত, হইলো, বিদ্যাবাগীশ সেই বেদীতে আসন গ্রহণ করিলেন। ৭ পৌষ বৃহস্পতিবার দিনে, দুপুরবেলা তিন ঘন্টার সময়ে ২১ জন যুবক সেই বৃদ্ধ আচার্যের কাছে দীক্ষার্থী হইয়া তাঁহাকে ঘিরিয়া বসিলেন। তাঁহাদের সকলেরই মুখ ধর্মের উৎসাহে প্রদীপ্ত। দেবেন্দ্রনাথ প্রথমে বিদ্যাবাগীশের সামনে দাঁড়াইয়া বক্তৃতা করিলেন।তিনি বললেন, "অদ্য এই শুভক্ষণে এই পবিত্র ব্রাহ্মসমাজের মন্দিরে বিশুদ্ধ ব্রাহ্মধর্ম-ব্রত গ্রহণ করিবার জন্য আমরা সকলে আপনার নিকট উপনীত হইয়াছি। যাহাতে পরিমিত দেবতার উপাসনা হইতে বিরত হইয়া এক অদ্বিতীয় পরমব্রহ্মের উপাসনা করিতে পারি, যাহাতে সৎকর্মে আমাদের প্রবৃত্তি হয় এবং পাপমোহে মুগ্ধ না হই, এইরূপ উপদেশ দিয়া আমাদের সকলের মুক্তির পথ উন্মুক্ত করুন"।
দেবেন্দ্রনাথের এই বক্তৃতা শুনিয়া ও তাঁহার প্রাণের একাগ্রতা দেখিয়া বিদ্যবাগীশ আর চোখের জল রাখিতে পারিলেন না। তিনি শুধু বলিলেন, যে, রামমোহন রায়ের এই ইচ্ছাই ছিল। কিন্তু তিনি তাহা কাজে পরিণত করিয়া যাইতে পারেন নাই। এতদিন পরে তাঁর সেই ইচ্ছা পূর্ণ হইলো। প্রথমে শ্রীধর ভট্টাচার্য উঠিয়া বেদীর সামনে প্রতিজ্ঞা পাঠ করিয়া ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করিলেন। পরে শ্যামাচরণ ভট্টাচার্য, পরে দেবেন্দ্রনাথ। তারপরে ব্রজেন্দ্রনাথ, গিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রভৃতি ২১ জন ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করিলেন।
'মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর': অজিতকুমার চক্রবর্তী।
দেবেন্দ্রনাথ তাঁর 'আত্মজীবনী'তে (প্রিয়নাথ শাস্ত্রী অনুলিখিত) স্বয়ং এই দিনের তাৎপর্য প্রসঙ্গে লিখেছেন:
"অদ্য আমাদের প্রতি হৃদয়ে ব্রাহ্মধর্ম-বীজ রোপিত হইবে। আশা হইল, এই বীজ অঙ্কুরিত হইয়া কালে ইহা অক্ষয়-বৃক্ষ হইবে এবং যখন ইহা ফলবান হইবে, তখন ইহা হইতে আমরা নিশ্চয়ই অমৃতলাভ করিবো"।
আজ ৭ পৌষ, এই মহান দিনটিকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
সৌজন্যে: রামমোহন রায় ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল স্টাডিজের ফেসবুক পেজ
✍️ - বেরাদর অর্ণব নাগ
পুরুষ ও নারীর সাম্য :
"স্ত্রী ও পুরুষ উভয় জাতিই পরম পিতা পরমেশ্বরের তুল্যরূপ স্নেহ ও আশির্বাদের পাত্র। স্ত্রীরা গৃহকে উজ্জল করেন। স্ত্রীরা গৃহের শ্রীস্বরূপা, স্ত্রীতে ও শ্রীতে কিছুই বিশেষ নাই । অতএব তাহাদিগের প্রতি যত্ন সমাদর ও সন্তোষ প্রদর্শন করিবেক।।" (ব্রাহ্মধর্ম গ্রন্থ, দ্বিতীয় খণ্ড, 'গাহস্থ সম্বন্ধ', দ্বিতীয় অধ্যায়, শ্লোক - ১০)
"পতি ও পত্নী কি ধর্মে, কি সাংসারিক কার্যে, কি ভোগে পরষ্পরকে অতিক্রম করিবেন না ; সংক্ষেপেতে তাঁহাদের এই পরম ধর্ম জানিবে।।" (ব্রাহ্মধর্ম গ্রন্থ, দ্বিতীয় খণ্ড, 'গাহস্থ সম্বন্ধ', দ্বিতীয় অধ্যায়, শ্লোক - ১২)
"পতি ও পত্নী উভয়েই হইতে আপনাদিগকে যত্নপূর্বক রক্ষা করিবেন। পরমেশ্বর কি শুভ অভিপ্রায়ে পরষ্পরকে কিরূপ গুরুতর সন্মন্ধে সন্মিলিত করিয়াছেন, তাহা সর্বদা অন্তরে জাগরূক রাখিবেন স্ত্রী-পুরুষের বিশুদ্ধ প্রেম ঈশ্বরের প্রিয় ও সমুদয় জগতের প্রিয়, এবং দম্পতির কল্যাণকর, বংশের কল্যাণকর ও সমুদায় সংসারের কল্যাণকর। পরষ্পর যত্নবান হইয়া তাহা পরিবর্ধিত করিবেন; মনে মনেও তাহার বিরুদ্ধাচরণ করিবেন না। উভয়ের হৃদয় এক হবে, উভয়ের লক্ষ্য এক হবে, উভয়ের সুখ-দুঃখ এক হবে, ইন্দ্রিয় সুখ ক্ষুদ্র বোধ করবে। সামান্য আলাপ পরিত্যাগ করিবে - ঐহিক ও পারত্রিক মঙ্গল আলোচনা করবে। উভয়ে নিজেদের পরমেশ্বরের দাস-দাসী বিবেচনা করিবেন।।" (ব্রাহ্মধর্ম গ্রন্থ, দ্বিতীয় খণ্ড, 'গাহস্থ সম্বন্ধ', দ্বিতীয় অধ্যায়, শ্লোক - ১৩)
"স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সন্তষ্ট থাকবে। কেহ কাহারও প্রতি উগ্ৰতা প্রদর্শন, অপরকে হীনবোধ, অবিশ্বাস করিবেন না। একের মাতা-পিতাকে উভয়েই মাতা-পিতা বলিয়া বোধ করিবেন, একের ভ্রাতা-ভগিনীকে উভয়েই ভ্রাতা-ভগিনী বলিয়া বিবেচনা করিবেন, একের সুখ-দুঃখ ও সম্পদ বিপদ উভয়েই বিভাগ করিয়া লইবেন; এবং উভয়েই পবিত্রতা, শান্তি, শুভ বুদ্ধি ও ধর্ম-বলের জন্য সেই মঙ্গলময় পরমব্রহ্মের শরণাপন্ন হইয়া থাকিবেন।। (ব্রাহ্মধর্ম গ্রন্থ, দ্বিতীয় খণ্ড, 'গাহস্থ সম্বন্ধ', দ্বিতীয় অধ্যায়, শ্লোক - ১৪)
প্রত্যেক ব্রাহ্ম তার পরিবারে ও সমাজে পুরুষ ও নারীর স্বাধীনতা, অধিকার-সাম্যর আদর্শের নিকটে সর্বদা বিশ্বস্ত থাকিবেন। ব্রাহ্ম গৃহী তার পুত্র ও কন্যাকে সমানভাবে জ্ঞান ও ধর্ম শিক্ষা দিবেন। পরিবারের তাবৎ ব্যাবস্থায়, অর্থের ব্যাবহারে, এবং সন্তান পরিচালনে, ব্রাহ্ম পতি ও পত্নী উভয়ে উভয়কে সমান জ্ঞান করিয়া শ্রদ্ধা ও প্রীতির সহিত পরস্পরের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া কার্য্য করিবেন। উভয়ে মিলিত হয়ে পরিজনগন সহ উপাসনা করিবেন, এবং উভয়েই সেই উপাসনাতে আচার্য এর কাজ করিবেন।
অর্থোপার্জন করিয়া স্বাধীন ভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াইবার য্যোগ্যতা পুত্র ও কন্যাতে সমানভাবে সঞ্চয় করিবার জন্য প্রত্যেক ব্রাহ্ম যত্ন করিবেন। ব্রাহ্মরা বাল্যবিবাহ পুত্র ও কন্য উভয়ের পক্ষে সমান পরিত্যাজ্য বলিয়া মনে করিবেন। বিবাহবিচ্ছেদা স্ত্রী ও বিধবাদিগকে ব্রাহ্মসমাজ পুনবিবাহের অধিকার সমান ভাবে দান করিয়াছেন। বিবাহের পরে ব্রাহ্মের এমন উইল করা উচিৎ, এবং আজীবন তাহা বলবৎ রাখা উচিৎ, যাহাতে পতির সম্পত্তিতে পত্নীর আইন সঙ্গত অধিকার বরতায়। ইহার অভাবে অনেক স্থলে পতির মৃত্যুর পর পত্নীকে পতির আত্মীয়গনের গলগ্ৰহ হইয়া আত্মসন্মান হারাইতে হইয়াছে। যদি কোনোও পিতৃসম্পত্তিতে পূর্ব আইনের দ্বারা কন্যার কোনো অধিকার না থাকে ইহা ব্রাহ্মধর্মের আদর্শবিরুদ্ধ এবং এই অবাঞ্ছনীয় ব্যাবস্থার প্রতিকূলেও ব্রাহ্মদিগের উইল করা উচিত।
সূত্র : ১) ব্রাহ্মধর্ম গ্রন্থ।
২) ব্রাহ্মধর্ম ও ব্রাহ্মসমাজ।
25/11/2023
'সাধনাশ্রম', সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ এর উদ্যোগে গত ৮ থেকে ১২ নভেম্বর ব্রাহ্ম যুবকদের দ্বারা, ডেঙ্গি প্রতিরোধে আমাদের কী কী করণীয়— তা নিয়ে পোস্টার এর সাহায্যে কলকাতা সংলগ্ন জেলা জুড়ে সচেতনতা মূলক প্রচার চালানো হয়।
17/11/2023
ব্রাহ্মধর্ম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে যেমন কৌতুহল আছে ঠিক তেমনই বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারনাও আছে তাই সবাইকে এই ভিডিওটি দেখার অনুরোধ রইলো। ভিডিওটি ভালো লাগলে 'Like' করবেন এবং 'Share' করবেন আর অবশ্যই "সাধনাশ্রম, সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের" এই Youtube চ্যানেল টি 'Subscribe' করবেন।
ব্রাহ্মরা কি নাস্তিক না আস্তিক ? || ব্রাহ্মদের ইশ্বর কে ? পর্ব - ১ |বক্তা - শ্রী সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়
30/09/2023
শিবনাথ শাস্ত্রী (৩১.০১.১৮৪৭ - ৩০.০৯.১৯১৯)
১৮৪৭ সালের ৩১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার চাংড়িপোতা গ্রামে এক গোঁড়া হিন্দু ব্ৰাহ্মণ পরিবারে শিবনাথ শাস্ত্রী জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শিবনাথ শাস্ত্রী একাধারে একজন সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সমাজ-সংস্কারক, লেখক, অনুবাদক, ঐতিহাসিক এবং ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক। তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স (১৮৬৬) এবং সংস্কৃত কলেজ থেকে এফএ (১৮৬৮), বিএ (১৮৭১) ও এমএ (১৮৭২) পাস করেন। পরে ওই কলেজ থেকেই ১৮৭২ খ্ৰী সংস্কৃতে এম.এ. পাশ করে "শাস্ত্রী" উপাধি পান। ১৮৭৩–৭৪ খ্রী. মাতুল দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের বিখ্যাত ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন এবং হরিনাভির স্কুলটিও তিনিই দেখতেন। তাঁর ‘আত্মচরিত’ পুস্তকে ১৮৬৮ খ্রী. তাঁরই উৎসাহে সম্পাদিত বিপত্নীক যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ ও বিধবা মহালক্ষ্মীর বিবাহের বিষয় বর্ণিত আছে। এই বিবাহের প্ৰায় সব খরচ বিদ্যাসাগর মহাশয় বহন করেন। এই উপলক্ষে পিতার ক্ৰোধ সত্ত্বেও সমাজে নবদম্পতিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি বহু দুর্যোগ মাথা পেতে নেন এবং উপেন দাসের সঙ্গে নবকৃষ্ণ বসুর বিধবা কন্যার বিবাহেও তিনি সাহায্য করেন।
হিন্দু ব্ৰাহ্মণ পরিবারে জন্ম হলেও হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত পৌত্তলিকতা, কুসংস্কার ও অর্থহীন আচার-আচরণের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা জন্মায়। ১৮৬৯ সালে পিতার প্রবল বাধা সত্ত্বেও তিনি ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন ফলে উপবীত ও মূর্তিপূজার সঙ্গে এখানেই তাঁর ইতি ঘটে যার ফলস্বরূপ পিতা কর্তৃক বিতাড়িত হন। পিতার প্রবল বাধার সামনে দাঁড়িয়ে ধর্মপরায়ণ এই মানুষটি বলেছিলেন, “আপনার সকল আজ্ঞা পালন করিতে রাজি আছি, কিন্তু আমার ধর্মজীবনে হাত দিবেন না”।
১৮৬৭ সাল পর্যন্ত আদি ব্রাহ্মসমাজ এরসাথে তাঁর গভীর সংযোগ দেখা যায়। কিন্তু সেইসময় ব্রাহ্মসমাজের জনপ্রিয় নেতা কেশবচন্দ্র সেনের আদর্শ ও কাজকর্মে শিবনাথ শাস্ত্রী আকৃষ্ট হন এবং ১৮৬৯ সালের ২২শে অগাস্ট তিনি কেশবচন্দ্র সেনের দলে যোগ দেন। এরপরে কেশবচন্দ্র সেনের ‘Indian Reforms Association-এর সাথে যুক্ত হন, এই সভার বহুবিধ কর্মতালিকা ছিল, যথা : 'মদ্যপান নিবারণ' এবং 'শিক্ষা', 'সুলভ সাহিত্য' ও 'কারিগরী বিদ্যার' প্রচার। ১৮৭০ সালে মদ্যপানের বিরোধিতা কল্পে তিনি প্রকাশ করেন "মদ না গরল" শীর্ষক একটি মাসিক পত্রিকা। পরে তিনি 'সোমপ্রকাশ' (১৮৭৩-৭৪) ও ধর্মবিষয়ক 'সমদর্শী পত্রিকা' (১৮৭৪) এবং আরও পরে 'তত্ত্বকৌমুদী', 'ইন্ডিয়ান মেসন্জর' ও 'মুকুল' (১৮৯৫) পত্রিকা সম্পাদনা করেন। নারী-মুক্তি আন্দোলনেও তিনি কেশবচন্দ্রের সহযোগী ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তাদের বলিষ্ঠ আন্দোলনের ফলেই ১৮৭২ খ্রী. আইনতভাবে মেয়েদের বিবাহের ন্যূনতম বয়স-সীমা চোদ্দ বছর নির্ধারিত হয়।
তিনি কেশবচন্দ্র সেনের ভারত আশ্রমের বয়স্কা মহিলা বিদ্যালয় (১৮৭২), ভবানীপুর সাউথ সুবারবন স্কুল (১৮৭৪) এবং হেয়ার স্কুলে (১৮৭৬) শিক্ষকতা করেন।
এরপরে ১৮৭৭ সালে ব্রাহ্ম যুবকদের নিয়ে "ঘননিবিষ্ট" নামে একটি বৈপ্লবিক সমিতি সংগঠিত করে পৌত্তলিকতা ও জাতিভেদের বিরুদ্ধে এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকার ও সর্বজনীন শিক্ষার পক্ষে সংস্কার আন্দোলনের সূচনা করেন। সমিতির কাৰ্যসূচীতে জাতীয়তামূলক ও সমাজ-সংস্কারমূলক শিক্ষা এবং রাষ্ট্ৰীয় স্বাধীনতার পরিকল্পনা ছিল। তাঁর গুপ্ত সমিতিতে আনন্দমোহন বসু ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ দিয়েছিলেন। তাদের অন্যান্য অঙ্গীকার ছিল-জাতিভেদ অ-স্বীকার, সরকারী চাকরি অ-স্বীকার, সমাজে নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত করা ইত্যাদি। অশ্বারোহণ ও বন্দুক-চালনা শিক্ষা এই সমিতির কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাঁরই রচিত ‘যুগান্তর’ নামে সামাজিক উপন্যাস থেকে ‘যুগান্তর’ পত্রিকার (১৯০৭) নামকরণ হয়।
পরবর্তী কালে কেশবচন্দ্রের কার্যকলাপ, কেশবচন্দ্র সেনের ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মোসমাজে অবতারত্বের অবতারণা, বৈষ্ণবসুলভ আচরণ ইত্যাদি নিয়ে যখন প্রশ্ন ও বিরোধ দেখা দিতে থাকে, কেশবচন্দ্র সেনের সমালোচনা করে ‘সমদর্শী’ ও ‘সমালোচক’ নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তার সম্পাদক ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী স্বয়ং। এরপরে ১৮৭৮ খ্রী. নানান বিবাদ বিসম্বাদের পরেও কেশব সেন যখন নিজের নাবালিকা কন্যার হিন্দুমতে বিবাহ দেন, তখন পাকাপাকিভাবে দলত্যাগ করেন শিবনাথ শাস্ত্রীসহ বহুজন, এরই ফলশ্রুতিতে ১৫ই মে ১৮৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় 'সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ' । এখন থেকে তিনি সমাজ-সংস্কারে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তিনি ধর্মপ্রচার ছাড়াও সারা ভারতে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতি এবং সাম্যের কথাও প্রচার করেন। মাদ্রাজ ভ্রমণের সময়ে সেদেশের 'জাতিভেদ ও ছুঁৎমাৰ্গকে' তীব্রভাবে আক্রমণ করেন।
শিক্ষাপ্রসারের জন্য আনন্দমোহন বসু ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একযোগে 'সিটি স্কুল' (১৮৭৯) স্থাপন করেন এই বছরেই ‘স্টুডেন্টস সোসাইটি’ নামে একটি গণতান্ত্রিক ছাত্র প্রতিষ্ঠান গঠিত হয় এবং নারী শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে মেয়েদের নীতিবিদ্যালয় (১৮৮৪) স্থাপন করেন। ব্রাহ্ম সমাজের পক্ষে ভারতের প্রথম কিশোর মাসিক পত্রিকা "সখা" (১৮৮৩) তাঁর উদ্যোগেই প্রকাশিত হয়। ১৮৯২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর ঈপ্সিত লক্ষের প্রতি প্রথম পদক্ষেপ করলেন "সাধন-আশ্রম" প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এই সাধন পথে শুধু নিজেকেই ব্যাপৃত রাখলে চলবে না, একদল যুবক চাই যাঁরা ব্রাহ্ম আদর্শকে বুকে ধারণ করে এই আধ্যাত্মিক সাধন-মার্গকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। গড়ে তুললেন ব্রাহ্ম কর্মী মণ্ডলী, 'ব্রাহ্ম ওয়াকার্স গ্রুপ'। তবে সাধন আশ্রমের কর্ম শুধু কলকাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তৎকালীন অখণ্ড ভারতের বিহারের বাঁকিপুর, লাহোর, ঢাকা, এলাহাবাদ, বাংলার উলুবেড়িয়ার সন্নিকটস্থ বাণীবন, কলকাতার উপকণ্ঠে আড়িয়াদহে সাধন আশ্রমের শাখা স্থাপিত হয়। সেবা কাজ এই প্রতিষ্ঠানের মুখ্য উপজীব্য ছিল। এর দ্বারা পরিচালিত সেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে 'বাংলা ও আসামের অনুন্নত শ্রেণির উন্নতি বিধায়িনী সমিতি', 'ঢাকা হিন্দু বিধবা আশ্রম', 'রামমোহন রায় সেমিনারি' পাটনা, 'হাজারীবাগ দাতব্য চিকিৎসালয়' সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরূপে তাঁর রচনার সংখ্যা অনেক। রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ (১৯০৪), আত্মচরিত (১৯১৮), History of Brahma Samaj ইত্যাদি তাঁর গবেষণামূলক আকরগ্রন্থ। বাংলা প্ৰবন্ধকাররূপে তাঁর খ্যাতি সর্বাধিক। তাঁর রচিত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:, নির্বাসিতের বিলাপ (১৮৬৮), পুষ্পমালা (১৮৭৫), মেজ বৌ (১৮৮০), হিমাদ্রি-কুসুম (১৮৮৭), পুষ্পাঞ্জলি (১৮৮৮), যুগান্তর (১৮৯৫), নয়নতারা (১৮৯৯), রামমোহন রায়, ধর্মজীবন (৩ খন্ড, ১৯১৪-১৬), বিধবার ছেলে (১৯১৬), ‘Men I have seen’ ইত্যাদি। তাঁর ‘মেজ বৌ’ উপন্যাসটির ইংরেজী অনুবাদ ইংল্যান্ডের Indian National Journal-এ প্রকাশিত হয়েছিল।
পরিশেষে বলা যায় নিজের বিশ্বাস ও কাজে তিনি কোনোদিনই ফারাক রাখেননি। যদিও সে পথ খুব সহজ ছিল না। পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছেদ, প্রথম স্ত্রীকে হারিয়ে ফেলা – মূল্য হিসেবে দিতে হয়েছিল অনেককিছু। তাঁর ধর্মজীবনের ভাবনা জুড়েছিল তাঁর মানবিকতা, সমাজচিন্তা ও সমাজসংস্কারের মধ্যেই। তিনি ছিলেন 'ধর্মপরায়ণ'। তার মূলে সংস্কারমুক্ত যুক্তিবাদী মন থাকলেও, সেটির প্রকাশ ঘটত ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমেই।
আজ এই মহাপুরুষের ১০৪ তম প্রয়াণ দিবস। ১৯১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কলকাতায় এই মহামানব শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।।
25/09/2023
কলকাতা শহর এবং সংলগ্ন জেলাগুলিতে প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা। ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে বাঁচতে আমাদের সচেতন ও এর প্রতিরোধে সবাইকে সামাজিক দায়িত্ব মনে করে এগিয়ে আসতে হবে। নীচের বিষয়গুলি মেনে চলুন। ডেঙ্গু নিয়ে সচেতন হোন অযথা আতঙ্কিত হবেন না। সুরক্ষিত থাকুন আপনি এবং আপনার পরিবার।
24/09/2023
গতকাল ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২৩, সাধারন ব্রাহ্মসমাজ, 'সাধনাশ্রম' কর্তৃক আয়োজিত হয়েছিল "গ্ৰীক দর্শন ও ব্রাহ্মসমাজ" সম্পর্কিত এক আলোচনা সভা। উক্ত আলোচনা সভায় এক অনবদ্য বক্তব্য রাখেন লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজের বিশিষ্ট অধ্যাপিকা ডঃ শ্রীমতী মুখার্জী।
ব্রাহ্মধর্মে কি জাতিভেদ প্রথা আছে ?
পরমব্রহ্ম কাহাকে নীচ ও কাহাকে উচ্চ বা মহৎ করিয়া সৃষ্টি করেন নাই। তিনি সমস্ত জাতির, সমস্ত নর-নারীর সৃষ্টিকর্তা তথা পিতা-মাতা। ব্রাহ্মরা বিশ্বাস করেন কাহাকেও নীচ মনে করিলে ঈশ্বরের অবমাননা করা হয় তাই ব্রাহ্মেরা জাতিভেদ প্রথা মানেন না। ব্রাহ্মধর্মে সকল মানুষ সমান, সকলের সমান অধিকার। সুতরাং ব্রাহ্মেরা কাহাকেও নীচ মনে করিয়া ঘৃণা করিতে পারেন না।
জাতিভেদ প্রথা সমাজে পরষ্পরের মধ্যে একতা ও আত্মীয়তা স্থাপন করিতে দেয় নাই, ও সকলকে ইচ্ছামত জ্ঞান অর্জন, পেশা বা শারীরিক পরিশ্রম করিয়া সংসারের উন্নতি করিতে না দেওয়াতে দেশে দুঃখ, দারিদ্র্য, অসাম্য, শ্রেণি-বৈষম্য, সম্পদের অসম বন্টন ইত্যাদি বৃদ্ধি করিয়াছে। যতদিন জাতিভেদ প্রথা প্রচলিত থাকবে, ততদিন 'একতা', 'ভ্রাতৃত্ব' ও 'আত্মীয়তা' যা বহুল পরিমাণে সামাজিক উন্নতির মূল, ঈশ্বরের সৃষ্টি বিরোধী এই কু-প্রথা তাহা প্রকৃতরূপে স্থাপিত হইতে দিবে না।
পরমব্রহ্মের উপাসনা করিবার কাহার কাহার অধিকার আছে ?
ব্রাহ্ম ধর্মমতে প্রত্যেক নর নারী -- ধনী-নির্ধন, জ্ঞানী-অজ্ঞানী, সাধু-অসাধু, এবং সকল জাতিরই পরমব্রহ্মের উপাসনা করিবার অধিকার আছে। পরমব্রহ্ম কাহাকে নীচ ও কাহাকে উচ্চ বা মহৎ করিয়া সৃষ্টি করেন নাই। তাঁহার নিকটে জাতির বিচার নাই। তিঁনি জগতের পিতা মাতা, সমস্ত নরনারী তাঁহার পুত্র কন্যা ; সকলের সমান অধিকার।
ব্রহ্মের স্বরূপ কি ?
পরমব্রহ্ম 'এক ও অদ্বিতীয়' এবং 'নিরাকার'। তাঁহার কোনো আকার নাই ; হস্তপদাদি কোন অবয়ব নাই ; চক্ষু কর্ণাদি কোন ইন্দ্রিয় নাই ; এবং আমাদিগের ন্যায় তাঁহার কাম, ক্রোধ, হিংসা, হর্ষ ও শোক নাই। ইন্দ্রিয় সকল তাঁহাকে জানতে পারে না। পরমব্রহ্ম 'সত্যস্বরূপ', 'জ্ঞানস্বরূপ', 'প্রেমস্বরূপ' ও 'পবিত্রস্বরূপ'। এই জগৎ ও জগতে যত বস্তু আছে কিছুই চিরস্থায়ী সত্য নহে। পরমব্রহ্মের ইচ্ছা হইলে তাহারা একদিন না একদিন ধ্বংস হইতে পারে। পরমব্রহ্ম সেইরূপ বস্তু নহেন। তিঁনি চিরদিন আছেন ও চিরদিন থাকিবেন, সৃষ্টির পূর্বে কিছু ছিল না, একমাত্র তিঁনিই ছিলেন। তিঁনি জ্ঞানে, প্রেমে, পবিত্রতায় ও শক্তিতে অনন্তস্বরূপ। তাঁহার আদি ও অন্ত নাই। তাঁহার কোনো সীমা নেই, তিনি অসীম। তাঁহার কেউ সীমা অতিক্রম করিতে পারে না।
পরমব্রহ্ম 'সৃষ্টি-কর্তা'। এই জগৎ পূর্বে ছিল না। একমাত্র পরমব্রহ্মের ইচ্ছাতেই এই বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড-সমূহ সৃষ্ট হইয়াছে, তাঁহার ইচ্ছাতেই যাহা কিছু দৃশ্যবান অস্তিত্ত্বে আসিয়াছে। জল, বায়ু, অগ্নি প্রভৃতি বিশ্ব-নির্মাণের সকল উপকরণ, পৃথিবী এবং প্রাণ, মন ও সমুদয় ইন্দ্রিয়, কেবল সেই সর্বশক্তিমান পরমব্রহ্মের আপন ইচ্ছাতেই সৃষ্টি হইয়াছে। পরমব্রহ্ম 'পালনকর্তা', সকল জীব, সকল পদার্থকে তিঁনিই পালন করিতেছেন। তিঁনি সর্বশক্তিমান। তাঁহারই শাসনে সকল কিছু শাসিত হইতেছে। সর্বনিয়ন্তা পরমব্রহ্মের ইচ্ছার অনুগত হইয়া অগ্নি উত্তাপ দিতেছে, সূর্য প্রকাশ পাইতেছে, মেঘ বারি বর্ষণ করিতেছে, বায়ু সঞ্চালিত হইতেছে, এবং মৃত্যু সঞ্চারণ করিতেছে। কোন পদার্থ তাঁহার ইচ্ছা, তাঁহার শাসন অতিক্রম করিতে পারে না ; চন্দ্র, সূর্য, গ্ৰহ, নক্ষত্র, জল, বায়ু, ইহারা জড় পদার্থ হইয়াও তাঁহার ভয়ে স্ব স্ব কর্মে ধাবমান হইতেছে।
পরমব্রহ্ম আত্মার আত্মা 'পরমাত্মা', চৈতন্যরূপে বিরাজ করিতেছেন। তিনি জ্ঞানস্বরূপ। আমাদের ন্যায় তাঁহার জ্ঞান সীমাবদ্ধ নহে। তাঁহার জ্ঞানের কার্য স্বভাবসিদ্ধ। কোন বিষয় জানিবার নিমিত্ত সেই সর্বজ্ঞ জ্ঞানবান, জ্ঞানময়, জ্ঞানস্বরূপ ব্রহ্মের কোনো ইন্দ্রিয়ের আবশ্যক হয় না। তিঁনি এক সময়ে ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান তিনকাল জানিতে পারেন, কাল-সকল তাঁহার হইতে উৎপন্ন, কিন্তু তিঁনি কালাতীত।
পরমব্রহ্ম 'মঙ্গল-স্বরূপ'। তিঁনি প্রেমস্বরূপ, নিত্যক্রিয়াশীল; মঙ্গলভাবে পরিপূর্ণ থাকিয়া সকল জীবকে অনন্ত প্রেম ও অনন্ত করুণায় প্রতিপালন করিতেছেন। পরমব্রহ্ম অন্তর্যামী, হদয়ের সকল বিষয় জানিতে পারেন ও নিয়ন্ত্রিত করেন। তিঁনি শুদ্ধ ; পাপ তাঁহাকে স্পর্শ করিতে পারে না। পরমব্রহ্মের স্মরণে পাপীর পাপ দূরীভূত হয়।
24/08/2023
আজ ৬ ভাদ্র: ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠার দিন
ব্রাহ্ম-আন্দোলনের ইতিহাসে আজ এক স্মরণীয় দিন। ১৭৫০ শকাব্দের ৬ ভাদ্র (২০ আগস্ট, ১৮২৮) রামমোহন রায় 'ব্রাহ্মসমাজে'র (রামমোহন প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির নাম ব্রাহ্মসমাজ-ই। ১৮২৯ সালের ৬ জুন স্বাক্ষরিত ব্রাহ্মসমাজের নিজস্ব বাড়ি ও জমি ক্রয়ের কবালায় 'ব্রাহ্মসমাজ' নামেরই উল্লেখ আছে। ১৮৩০ সাল নাগাদ সমকালীন সংবাদপত্রে ব্রহ্মসভা নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রভাতচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় ও সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর অনুমান ধর্মসভার সঙ্গে রেশারেশির কারণে এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্রহ্মসভা নামের উৎপত্তি। বলা বাহুল্য, এই ব্রাহ্মসভা নামটি লোক-প্রচলিত ধারণা মাত্র। রমাপ্রসাদ রায়ের বাড়ি থেকে কবালাটি উদ্ধার হওয়ার পর এটা স্পষ্ট যে, প্রকৃত নাম 'ব্রাহ্মসমাজ'-ই) প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রাহ্ম-আন্দোলনের বীজ অবশ্য তার একযুগেরও বেশি সময় আগেই উপ্ত হয়েছিল, রামমোহন কলকাতায় আসবার পরই ১৮১৫ সালে তাঁর 'আত্মীয় সভা' সংস্থাপনের মধ্য দিয়ে। একেশ্বরবাদের প্রচার থেকে ব্রহ্ম উপাসনা, 'আত্মীয় সভা' সার্থকভাবেই ব্রাহ্মসমাজের পূর্বসুরী। ১৮২১ সালে রামমোহনের প্রভাবে একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী অ্যাডাম স্থাপনা করলেন 'ইউনিটেরিয়ান সোসাইটি'। সপুত্র ও সঅনুগামী রামমোহন এখানে নিয়মিত উপাসনায় যোগ দিতেন। কিন্তু বিদেশী ভাবের এই উপাসনা তাঁকে সন্তুষ্ট করছিল না। অবশেষে তারাচাঁদ চক্রবর্তী ও চন্দ্রশেখর দেবের প্রস্তাব মতো ও দ্বারকানাথ ঠাকুর, কালীনাথ মুন্সী, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, মথুরানাথ মল্লিক প্রমুখের সাহচর্যে রামমোহন এই সুমহৎ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে সক্ষম হন যা পরবর্তী শতাব্দীব্যাপী ভারতীয় সমাজ সংস্কারে ও ভারত তথা বঙ্গজ-নবচেতনায় দিগন্তবিস্তৃত ভূমিকা নিয়েছিল।
প্রথমে উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলে শিবনারায়ণ রায়ের প্রাসাদোপম বাড়ির দক্ষিণে একটি স্থান নির্বাচিত হলেও পরে উপাসনার পক্ষে নিরিবিলি বিবেচনায় চিৎপুর রোডের ধারে মেসার্স ডিসুজা অ্যান্ড কোম্পানি নামক পর্তুগিজ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কমললোচন বসু (মতান্তরে রামকমল বসু), যিনি ফিরিঙ্গি কমল বসু নামেই সমধিক খ্যাতিমান ছিলেন, তাঁর বাড়ির দুটি ঘর ভাড়া নিয়ে ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করেন। এখানে প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় উপাসনা হতো। দুজন তেলেগু ব্রাহ্মণ বেদ ও উৎসবানন্দ বিদ্যাবাগীশ উপনিষদ পাঠ করতেন। রামচন্দ্র বিদ্যবাগীশ বৈদিক শ্লোকের ব্যাখ্যা দিতেন ও শেষে ব্রহ্ম-সংগীত হয়ে সভার সমাপ্তি ঘটতো। ১৭৫১ শকাব্দের ১১ মাঘ (২৩ জানুয়ারি, ১৮৩০) ফিরিঙ্গি কমল বসুর বাড়ির অব্যবহিত উত্তরদিকে ব্রাহ্মসমাজের নিজস্ব বাড়ি না হওয়া পর্যন্ত প্রায় দেড় বছর এই বাড়িই ছিল ব্রাহ্ম আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। আগে আপার চিৎপুর রোডের ৫১ দাগ নম্বরে ছিল এই বাড়িটির অধিষ্ঠান। বর্তমানে অবশ্য সেই বাড়ি নিশ্চিহ্ন। তার জায়গায় একটি শিশু হাসপাতাল তৈরি হয়েছে। চিৎপুর রোড রবীন্দ্র সরণিতে পরিণত হওয়ায় মিউনিসিপ্যাল নম্বরেরও পরিবর্তন হয়েছে; ৫১ হয়েছে ২২৮। প্রসঙ্গত, ফিরিঙ্গি কমল বসুর বাড়ি শুধু ব্রাহ্মসমাজ স্থাপনার কারণেই স্মরণীয় নয়, এই বাড়িতে এককালে হিন্দু স্কুলের অধিষ্ঠান ছিল এবং পরবর্তীকালে জেনারেল এসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশান বা উত্তরকালে স্কটিশচার্চ স্কুলও এই বাড়িতেই প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৩০ সালের ১৩ জুলাই।
এই ৬ ভাদ্রকে স্মরণে রেখেই ব্রাহ্মসমাজের ভাদ্রোৎসবের সূচনা। প্রথম কয়েক বছর এটিই সমাজের প্রধান উৎসব ছিল, পরে যার জায়গা ১৮৩০ সালের ১১ মাঘের স্মরণে মাঘোৎসব নিয়ে নেয়।
সবাইকে ভাদ্রোৎসবের আন্তরিক শুভেচ্ছা। সঙ্গে ফিরিঙ্গি কমল বসুর বাড়ি ভেঙে গড়ে ওঠা অধুনা শিশু হাসপাতালের ছবি।
✍️ ~ বেরাদর অর্ণব নাগ
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Contact the business
Website
Address
210/6, Bidhan Sarani Road, Simla, Machuabazar
Kolkata
700006
