🔥 শ্যামশ্রী
আমাকে শ্যাম বলো—
ঠিক আছে।
এই শ্যামের মধ্যেই যে শ্রী লুকিয়ে আছে,
সে শ্রী কোনো প্রসাধনের নয়,
সে শ্রী জন্মায়
অপরাজেয় প্রতিরোধ থেকে!
আমি শ্যামশ্রী—
চুপ ছিলাম বহুদিন,
কারণ তুমি চেয়েছিলে
আমার রং যেন হয়ে থাকে
অপরাধ, অভিশাপ, অন্ধকার।
কিন্তু ভুল করেছ!
অন্ধকারই তো আগুনকে জন্ম দেয়—
আর আমি আজ আগুন হয়ে দাঁড়িয়েছি।
তোমরা বলেছিলে—
ত্বকের রং মানেই শ্রেষ্ঠতা,
রূপ মানেই নিয়ম,
শক্তি মানেই কর্তৃত্ব।
কিন্তু আমি—
এক মুঠো কৃষ্ণ-ধূলির মতো
তোমাদের তৈরি মানচিত্রে
মহাদেশ বদলে দেব।
আজ আমি বলি—
আমার ত্বক কোনো নীরবতা নয়।
আমার রঙে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের লড়াই,
নির্বাসিতদের কান্না,
গুম হয়ে যাওয়া মানুষের ছায়া,
কিন্তু তার মধ্যেও
জ্বলে আছে পুনর্জন্মের দাবি।
আমি শ্যামশ্রী—
আমি প্রতিবাদ করি
সেই চোখের বিরুদ্ধে
যারা কালো আকাশ দেখলে ভয় পায়
কিন্তু অন্যায়ের ঝড় দেখেও নীরব থাকে।
আমি প্রতিবাদ করি
সেই হাতের বিরুদ্ধে
যারা “শক্তি”র নামে
প্রতিদিন কয়েকজনের পিঠে
অদৃশ্য চাবুক মারছে।
আজ আমার কণ্ঠ রুখে দাঁড়িয়েছে—
“তোমাদের বিচার, তোমাদের রং, তোমাদের শ্রেণির দেয়াল—
সব ভেঙে ফেলব!”
কারণ আমি জানি,
যে রং মাটির,
সে রং আগুনও হতে পারে।
আমি শ্যামশ্রী—
আমি বিদ্রোহের রঙ,
আকাশের মেঘ,
মহাকালের প্রতিশোধ।
আমি আসি
তোমাদের তৈরি নীরবতা ভেঙে
নতুন ভাষা লিখতে।
আজ থেকে—
আমার রং আর ব্যথা নয়,
আমার রং ঘোষণা।
আমার রং প্রতিবাদ।
আমার রং দাঁড়িয়ে থাকা—
সব দেয়ালের সামনে,
সব জুলুমের বিরুদ্ধে,
অটল, নির্মম, অবাধ্য।
হ্যাঁ—
আমি শ্যামশ্রী।
আর আজ
আমি কাউকে ভয় পাই না।
- লেখনীতে Joyanta Karmoker
মুক্ত বিহঙ্গ..Mukto Bihango
আমি শ্যামশ্রী, মনের কথাগুলোকে বিহঙ্গ?
19/02/2025
প্রতিবাদের ডাক
- শ্যামশ্রী কর্ম্মকার
আমরা নারীরা চাইনা কিছু, চাই শুধু নিজে বাঁচতে,
মুক্ত আকাশে মুক্তি পেয়ে দু'ডানা মেলে উড়তে।
আমরা নারীরা চাইনা বাঁচতে তোমাদের দয়াতে-
থাকতে দাও আমাদের আমাদের মতো করে নিজের পথে হাঁটতে।
তোমরা আমাদের ভেবোনা দেবী, চাইনা পেতে পুজা-
এক হাতে পুজো করে অন্য হাতে লুটো মজা!
পুজোর কোনো নেই প্রয়োজন, কেবল মানুষ ভেবো একটু;
মানুষের মাঝে মানুষ হয়েই বাঁচাই মোদের লক্ষ্য।
পথের কাঁটা হয়োনা কভু, হবে না হতে সঙ্গী,
নারী তার পথ গড়তে জানে হয়ে মুক্ত বিহঙ্গী।
নারী ভেবে দিয়ো না সুযোগ, নারীরা লড়তে জানে।
দয়া করে আঘাত করোনা আমাদের সম্মানে।
পথে নারী বর্জিতা - হায়! আজও এ সমাজ মানে,
কাদের জন্য নারীরা অসুরক্ষিতা - এ সমাজ কি জানে?
নারীরা সমাজের আরেক স্তম্ভ - এ সমাজ হয়েছে বিস্মৃত।
তাই বারবার এ সমাজের হাতে নারীরা হচ্ছে লাঞ্ছিত।
নারী বিনা এ সৃষ্টি অচল, নারী নাকি শক্তির উৎস।
কিন্তু এ কথা আজ সবার কাছে হয়ে গিয়েছে উপহাস্য।
কত শত ঘটনা ঘটছে নিত্য, তবুও হচ্ছে কই আলোরন?
এভাবেই ক্ষমতার কাছে যাচ্ছে ঢেকে নারীর ক্রন্দন।
কোন ধর্মে নারীদের উচ্চ স্থান এ নিয়ে চলতে থাকে তর্ক-বিবাদ উপাখ্যান -
আর বাস্তবতার মাটিতে নারীরা পথে ঘাটে সর্বত্র সহে চলেছে অপমান।
আজ নারীদের সম্মুখে এই অনুরোধ হয়োনা কেবল লক্ষ্মী -
কালিকার ন্যায় অস্ত্র ধরো, হয়ে রণচণ্ডী।
গর্জে উঠো এ সমাজ আজ, গর্জে উঠো নারী।
অপরাধীদের মুখোশ তবেই আমরা খুলতে পারি।
মৌন-মিছিল অনেক হল, দৃঢ় প্রতিবাদ দরকার।
তবেই শাসকের টনক নড়বে, তবে হবে এর প্রতিকার।
আজ এই ক্ষনে করো অঙ্গীকার, ভয়ের প্রাচীর ভেঙ্গে-
ঘর ছেড়ে পথে নামো - এই রণঙ্গনে।
~~~~~~~~
বিঃদ্রঃ কলকাতার আরজিকর মেডিকেল কলেজের অভয়ার হত্যার প্রতিবাদে লিখেছিলাম।
21/09/2023
#জীবনযাপন
-শ্যামশ্রী কর্ম্মকার
পর্ব- সপ্তদশ
" কি গো এমন করে বসে পড়লে, ওদিকে সব ঠিক আছে তো?"
অজিত কি একটা ইঙ্গিত করলো ঠিক বোঝা গেল না। সুমতি আর স্বামীকে কিছু জিজ্ঞেস করল না।
সকালে সবেমাত্র বাড়িতে এসে পৌঁছেছে অজিত। সুজিতকে কালকে সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছে এখানকার হাসপাতাল থেকে, পরিস্থিতি সঙ্গিন। তপন তো আছেই অজিতের বড় দুই ছেলে এখন বেশ বড়। তারা দুহাতে সবটা সামলাচ্ছে তাই রক্ষা। অপু বাবা আর পিসানের হাতে হাত রেখে সবটা সামলাচ্ছে। দীপু এদিকে আবার বাড়ির দরকার অদরকারে রয়েছে।আর ওদের ছোট ভাই তপু অনেকটাই ছোট, তাই ওর কাছে আশা করা উচিত নয়। তবুও সে বায়নাক্কা না করে ভাই বোনদের সাথে রয়েছে সবসময়।
সুমতি ঘরে গিয়ে এক গ্লাস জল নিয়ে এসে স্বামীকে দিলো। অজিত একচুমুকে জল শেষ গ্লাসখানা রেখে বললো " অপুর মা ভালো খবর কি বলব বলো। কালকের রাতটা কি করে কেটেছে আমি জানি। ডাক্তার বলেছেন সুজিতের নাকি নিজের বাঁচার ইচ্ছে চলে গিয়েছে। তাই এমন অবস্থা। "
"ঠাকুরপো কি সুস্থ হবে না গো।"
"কি জানি, ঠিক জানিনা। যাকে যাই বলি, তোমাকে মিথ্যা বলব না। ডাক্তার বাবু আশা দিতে পারেন নি।"
স্বামী স্ত্রী চুপচাপ উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে বসে রয়। মাস খানেক ধরে এতোটা ভেবেছে সব নিয়ে আর কিছু ভাবতে পারেনা।
এমন করে বেশ কিছুক্ষণ কাটার পরে "বম্মা কি করছো তোমরা?"
পেছন ঘুরে দেখে নয়ন এসে দাঁড়িয়েছে। সুমতি আর অজিত পরস্পরের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করার পরে বলে "গল্প করছিলাম, তুই এতো সকালে উঠলি কেন?"
নয়ন বম্মার গলা জড়িয়ে বললো "ঘুম ভেঙে গেল। "
সুমতি জানে কাল সারারাত উশখুশ করেছে তিন ভাইবোনে। মুখে কিছু না বললেও সবই বোঝে তারা।
"যা মা তবে শুয়ে থাক। শীতটা আজ বেশ পড়েছে ঠান্ডা লেগে যাবে।"
নয়ন ঘরে চলে যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে "জ্যাঠুন কালকে কোথায় গেছিলে?"
" একটা কাজ ছিল মা।"
নয়ন চুপ করে থেকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসে "বাবার অসুখ তাই না? "
অজিত স্ত্রীর দিকে এমন জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে তাকালো, সেটা দেখে সুমতি বুঝতে পারলো স্বামী ভেবেছে সে বলেছে কিনা। সুমতি ইশারায় জানালো সে কিছু বলেনি। সুমতি নয়নকে কোলে টেনে নিয়ে বললো "কে বললো তোকে? "
নয়ন বম্মার কোলে চুপ করে বসে শাড়ি আঙ্গুলে প্যাচাতে লাগলো।
" কি রে বললি না। " আবার বললো সুমতি।
নয়ন শান্তভাবেই বলল " আমি জানি.. "
" কচু জানিস তুই, অসুখ হয়েছিল, তবে এখন সেরে গিয়েছে। "
" যদি তাই হয়, তবে বাবা কি আমাদের দেখতে আসেনা কেন? বাবা মায়ের মতো কি আমাদের ভুলে গিয়েছে? "
সুমতি নয়নকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো "ধুর পাগলি বাবা মাকে কখনো ভুলতে পারে তাদের ছেলে মেয়েকে? বাবা কাজে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। তাই আসতে পারেনি, কাজ শেষ হলেই আসবে।"
নয়ন কি বুঝতে পারলো কে জানে, চুপ করে বম্মার কোলে মুখ গুঁজে বসে রইলো।
এখন সবে সাড়ে এগারোটা, অজিত মিনিট তিরিশেক হলো সবে বিশ্রামের পরে উঠেছেন। কাল রাতে ঘুম হয়নি,বিশ্রাম হয়নি তাই সুমতি দেবী স্বামীকে জোর করে বিশ্রাম নিতে বলেছিলেন। এমন সময় ছোট ছেলে তপু এসে এসেছে জানালো বাইরে কিছু লোকজন এসে তার খোঁজ করছে। অজিত ব্যবসায়ী মানুষ, সেই কাজেই কেউ এসেছে এটা বুঝতে পেরে বাইরে এসে দেখে তার আন্দাজ ভুল, দুইজন পুলিশ এসে দাঁড়িয়েছেন। অবাক হয়ে এগিয়ে যান অজিত।
" আচ্ছা আপনি অজিত? "
" হ্যাঁ আমি অজিত, কেন বলুন তো?"
" সে বলছি, আগে বলেন আপনার ভাইয়ের নাম সুজিত? "
" হ্যাঁ তাই,তবে কেন এসব প্রশ্ন করছেন? আমার ভাই কি আর নেই?"
" আহ্ কিসব বলছেন, আমি তো আপনার ভাইয়ের স্ত্রী আরতি দেবীর খোঁজ নিয়ে এসেছি, আপনি আর আপনার ভাই মিলেই তো থানায় মিসিং ডাইরী করে এসেছিলেন।"
অজিতের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে, "আপনারা আরতির খোঁজ পেয়েছেন?"
" হ্যাঁ, তবে নিশ্চিত নই।সেজন্যই আপনার ভাইয়ের বাড়ি গিয়েছিলাম, ওখানে কাউকে না পেয়ে আপনার আত্মীয়দের কাছে ঠিকানা পেয়ে এখানে এলাম। আপনারা গিয়ে দেখুন উনি কিনা।"
অজিত কথাটা বুঝতে পারলো না, কেন দেখতে হবে? আরতি কি নিজের পরিচয় দেয়নি, নাকি আরও খারাপ কিছু ঘটেছে। অজিত শঙ্কিত বক্ষে বললো "কেন আরতি কি নিজের পরিচয় দেয়নি?"
" সে নিজের পরিচয় দেওয়ার অবস্থায় নেই। তাছাড়া সেই মেয়েই যে আপনাদের বাড়ির নিশ্চিত হবো কি করে আমরা, যে ছবি আমাদের দিয়েছেন, তা বছর দশেক পুরনো, বিয়ের ছবি। যাইহোক কথা বাড়িয়ে লাভ নেই আপনার যদি যেতে হয় আমাদের সঙ্গে চলুন, না হয় কাল সকালে গিয়ে দেখা করবেন।"
অজিত কি করবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না। সুমতি আগেই দোরের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলো, এতোক্ষণ চুপ করে থাকলেও এবার বললো " কি গো বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলছো কেন? উনাদের নিয়ে বৈঠক ঘরে বসাও। আমি সামান্য জল মিষ্টি দিয়েছি।"
অজিত স্ত্রীর কথাই লজ্জিত হয়ে বলল" কিছু মনে করবেন না, মাথার একদম ঠিক নেই, আসুন আসুন ঘরে এসে বসেন।"
" না না তার কোনো প্রয়োজন নেই।"
সুমতি তেমনি করেই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল "তা কি হয়? এতো ভালো একটা খবর এনেছেন, মিষ্টি মুখ না করে ছাড়তে পারি?"
পুলিশ কর্মী দুইজন এমন আন্তরিকতায় বোধ হয় সংকোচবোধ করেই বললেন " খবরটা কতটা ঠিক তা তো আমরা জানিনা।"
" সে যাই হোক, আমাদের তো আপনারা আশা দেখালেন।" বলে স্বামী তাগাদা দিয়ে বললো "কি গো দাঁড়িয়ে রইলে কেন? উনাদের ঘরে নিয়ে যাও।"
পুলিশ কর্মীরা ব্যস্ত হয়ে বললেন "কি বলছেন আমাদের অফিসের কাজে কোথাও কিছু খাবার অধিকার নেই।"
" দিদির বাড়িতে সামান্য মিষ্টিমুখ করলে কিচ্ছুটি হবে না, আর না বলবেন না।"
পুলিশ কর্মী দুইজন আর না বলতে পারলেন না, অজিতের পিছু পিছু ঘরে গিয়ে বসলেন।
মিনিট খানেকের মধ্যে সুমতি কাজের মেয়েকে সাথে করে জল মিষ্টি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করতে করতে শুনতে পেলেন সুজিতের বিষয় জিজ্ঞেস করছে, ওরা হয়তো সুজিতকে সন্দেহ করছে। সুমতি এটাও বুঝতে পারলো অজিত আমতাআমতা করছে, তাই সে ঘরে ঢুকেই পুলিশদের উদ্দেশ্যে বলল "কিছু মনে করবেন না আপনাদের কথা শুনে ফেলেছি, তাই উত্তর দিচ্ছি। আপনারা হয়তো জানেন না আরতি আমার সম্পর্কে বোন হয়৷ সুজিত ভালো মানুষ দেখেই ওর সাথে আমি নিজে দাঁড়িয়ে বিয়ে দিয়েছি। আরতি সুজিত দুইজন দুইজনকে কতটা ভালোবাসে আমরা জানি। স্ত্রীর শোকে ছেলেটা মৃত্যুর সাথে লড়ছে।আরতি নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পরে থেকেই সুজিত ভবঘুরে হয়ে গিয়েছে, এখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ডাক্তাররা জানিয়েছেন অসুখটা শরীরের চেয়েও মনের বেশি, বাঁচতে চাইছে না সুজিত। আরতির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে এই কথাটা জানতে পেরে হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবে ছেলেটা।"
পুলিশকর্মী দুইজন চুপ হয়ে গেলেন, তবুও কিছুক্ষণ পরে বললেন "তাহলে আরতি দেবী ঘর ছাড়লেন কেন?"
" বাইরের একজন মানুষ ওদের পরিবারে একদিনের অতিথি হয়ে ওদের জীবন ওলট-পালট করে দিয়েছিল। আরতি বড্ড ভালোবাসে স্বামী ও ছেলে-মেয়েদের, সুজিত কোনো দিনও আরতির সাথে খারাপ ব্যবহার করেনি। আসলে আরতি এমন মেয়ে ওর সাথে কেউই খারাপ ব্যবহার করতেই পারবেনা। সুজিত বাইরের লোকের কথায় আরতিকে সন্তানদের থেকে দূরে থাকতে বলে, ওটা মেয়েটা সইতে পারেনি। রাগের মাথায় বেড়িয়ে যায়। সুজিত বুঝতে পারেনি রাগের মাথায় বলা কথাটা আরতির মনে এতটা আঘাত করবে। তারপর থেকে মানুষটা পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে স্ত্রীকে। "
পুলিশকর্মী দুইজন সুমতির কথা বিশ্বাস করলো কিনা কে জানে? তবে চুপ করে রইলো।
সুমতির চোখে জল এসে গিয়েছিল, চোখ মুছে বললো "এমা দেখুন আমি কি শুরু করেছি, আপনাদের মিষ্টিগুলো সামনে দিয়েছি,এদিকে খাবার সুযোগই দিচ্ছিনা।"
" না না ঠিক আছে, আমরাই তো জিজ্ঞেস করলেম।"
অজিত চুপ করেই ছিল, এতোক্ষণ পরে বললো "এবারে হাতে তুলে নিন মিষ্টির পাত্র খানা।"
" নিচ্ছি নিচ্ছি, তা বলছিলাম আপনি কি ঠিক করলেন, আজকে যাবেন?"
অজিত একবার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন "কি করি ঠিক করতে পারছিনা, সুজিতটাও হাসপাতালে ভর্তি। "
" কোথায় ভর্তি আছেন সুজিত বাবু?"
" সদর হাসপাতালে আছে।"
" তবে তো আপনাকে সদরে যেতেই হবে, আমাদের সাথে চলুন।"
সুমতি বললো " সেই ভালো উনাদের সাথে যাও, আগে একটু মুখে কিছু দিয়ে নাও।"
পুলিশকর্মীরা বললেন "সাথে কয়েকটি কাপড় আর অর্থ নিয়ে নেবেন। সাথে যদি কেউ যায় নিতে পারেন।"
এবারে ভ্রু কুঞ্চিত করে অজিত বললো "কেন?"
" আপনাকে মালদা যেতে হবে, ওখানেই ভর্তি আছে তো।"
কুমারগঞ্জ থেকে বালুরঘাট গিয়ে থানায় কথা বলে, তারপর মালদা যেতে হবে। তারমানে আজকে ফেরা যাবে কিনা সন্দেহ।
"আপনারা একটু বসুন আমি এক্ষুনি আসছি। "
বলে বাইরে বেড়িয়ে আসে আর স্ত্রীকে ইশারায় ডেকে নেন।
সুমতি বাইরে আসতেই বলে " কি করব বলো।"
" তুমি অপুকে সাথে নিয়ে চলে যাও। দীপু আছে তো। তপন সবে বাড়ি গিয়েছে। ওকে ডাকার দরকার নেই।"
" তাই করি। " বলে চলে যাচ্ছিলো অজিত।
সুমতি স্বামী ডেকে বললো "শুনো তুমি সুজিতের কাছে আগে যাবে, গিয়েই কানের কাছে বলবে আরতির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। "
" তাতে কি হবে? "
"আমার মন বলছে এই কথাটা জানতে পারলেই সুজিত ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবে আর তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে।"
অজিত বললো "চেষ্টা করে দেখি তোমার কথা অনুযায়ী, তুমি যাও অপুকে তৈরী হতে বলো। "
সুমতি মাথা দুলিয়ে চলে গেল।
চলবে...
17/09/2023
#অনন্য_ফুল
--শ্যামশ্রী কর্ম্মকার
" বাবু যাচ্ছিস কেনে? বলনা কত দিবি?"
" বললাম পাঁচশো দেবো, এর বেশি সম্ভব না।"
" দে না হাজার। "
" আমি বলছি তো হলে চল।"
চাঁপার একদম ইচ্ছে ছিল না ওই মানুষটার সাথে যায়। মোষের মতো শরীর, পিষে ফেলবে ওকে। কিন্তু হাতে একটা পয়সা নেই, কাল যে ওর কিছু টাকা চাই। কি রে যাবি তো চল। চাঁপা দোমনা করে রাজি হয়। সত্যি ঘন্টা দুয়েক ধরে লোকটা ওকে যেন পিষে ফেললো। তারপর হাসতে হাসতে বললো "তুই বেশ মাল রে, নে হাজার টাকাই দিলাম। আবার আসবো।"
চাঁপার শরীর ব্যথা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু খদ্দের, সেসব তো বলা যায়না, তাই হেসেই বললো "তা বাবু আসিস আবার, সারারাত থাকিস।"
" তোর যা খাই, সারারাত কত নিস?"
" তিন হাজারের কম হবে না। বাকি খদ্দের যে নিতে পারি না।"
" আচ্ছা আসব তিনই দেবো।"চাঁপা টাকাটা সরিয়ে রাখতে রাখতে দালাল এসে ঢুকে বলে
"কি রে কত পেলি? দে আমার ভাগটা।"
" যা এখান থেকে, নিয়ে আয় একটা খদ্দের ঠিক ভাগ পাবি?" বল্টু চাঁপাকে দেওয়ালের সাথে ঠেসে ধরে বলে "বেশি উড়িস না, অনেক নতুন নতুন মাল এসেছে, তোর আগের মতো বয়স নেই।"
চাঁপা বল্টুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বললো "মর হারামজাদা, ঘাটের মরা।"পাশের ঘরের মেয়েরা চিৎকার শুনে ছুটে আসতেই বল্টু ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যায়। চাঁপা তক্তপোশের একপাশে কেঁদে মুখে হাত ঢেকে কেঁদে ফেলে।
চাঁপার বয়স এখন বছর ছত্রিশ, অবশ্য দেখে বেশি মনে হয় না।চাঁপার কথা বলতে গেলে অতীত সামনে আসে। না, চাঁপাকে কেউ বিক্রি করে নি, সে নিজেই বেঁছেছিল, মানে বাধ্য হয়েছিল বাঁছতে এই জীবন। মা বাপের সংসারে অভাব ছিল, তবে পেটের ভাতের অভাব হয়নি কখনো। গ্রামের একটা ছেলে ফেরি করে বেড়াতো জামা কাপড়, গ্রাম দুই পরে বাড়ি। প্রেম করে পালিয়ে তাকে বিয়ে করে। এই বাড়ি এসে বুঝতে পারে অভাব আরও কতটা কঠিন হয়। বাড়িটাও ঠিক মতো নেই। মাটির বাড়ি একদিকে প্রায় ধ্বসে গিয়েছে। যেসব কাপড় বিক্রি করে সেসব থেকে মালিক খালি পার্সেন্টেজ দেয়। ওই নিয়ে নিজের পেট চলে না তো বৌয়ের পেট। বছর ঘুরতেই বাচ্চা পেটে চলে আসে। জীবন আরো দুঃসহ হয়ে ওঠে। পালিয়ে বিয়ে, বাপের বাড়ি ফেরার মুখ নেই। এদিকে স্বামী শামসুলের সেদিকে তাল নেই। কি করে সংসার চলে সে জানেনা। সকালে বেড়িয়ে সন্ধ্যার মুখে ফেরে। আয় সেই তিমিরেই। সবিনা, যা চাঁপার আসল নাম, বছর ঘুরতে না ঘুরতে আরেকটা বাচ্চা। স্বামী বললে শুনে না, ওপর আলার দান বলে, তিন বছরের সংসারে তিন বাচ্চার মা হয় সে। বাচ্চার কান্না সহ্য করতে পারে না, বাচ্চারা তো বাপের কাছে খাবার চায়না। মায়ের কাছে চায়।হঠাৎ পাশের বাড়ির ভাবী কোথায় যেন চলে গেল। নেই নেই খোঁজ নেই, হঠাৎ একদিন একবেলার জন্য এলো। সবিনার সাথে ভালো সখ্যতা ছিল, ওর সাথে দেখা করতে এলো গোপনে। তখনই জানতে পারে সুলেখার স্বামী তাকে কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছে। অনেক টাকা নাকি, টাকা দিতে এসেছে , নিজের ছোট দুটো বাচ্চাকে দেখতে এসেছে, শ্বশুর বাড়ির লোকেরা ওকে বাড়িতে ঢুকতে দেবেনা দেখে অশান্তি করছিল। যাবার সময় সবিনাকে একটা ফোন নাম্বার দিয়ে গেল। আর বলেছিল দরকার হলেই যোগাযোগ করতে। তবুও দাঁত চেপে আরও পাঁচ বছর থেকেছে ও। আর কোনো পথ না পেয়ে সেই তেইশ বছর বয়সে এখানে এসেছে, তা সে আজকের কথা আজ এক যুগের উপরে হয়ে গেল এখানে। কচি বয়স ছিল, প্রথম প্রথম তাই ভালো আয় হতো, বরের কাছে পাঠানোর সাথে সাথে বাপেরবড়িও পাঠিয়েছে ছোট দুই ভাইয়ের জন্য। তারা সবিনার সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়নি কিন্তু ওর টাকা নিতে অস্বীকার করেনি। বছর তিন পরে কি মনে হতে গিয়েছিল বরের কাছে। গিয়ে শুনে বর একজনকে বিয়ে করেছে, ওর দেওয়া টাকায় বাজারে কাপড়ের দোকান খুলেছে। সবিনা বরের সামনে যাবে না যাবে না করে ভেবেও গিয়েছিল, আর বলে এসেছিল মেয়েটার পনেরো বছর বয়েস পর্যন্ত টাকা পাঠাবে। ছেলে দুটোর দায়িত্ব বাপের।।আর খোঁজ নেবে ঠিক মেয়ের যত্ন নেওয়া হচ্ছে কিনা। শেষ পর্যন্ত মেয়েকে হোস্টেলে পাঠিয়ে শান্তি পায় সবিতা। মেয়েটা পাশ করেছে, বছর তিনেক হলো বিয়ে দিয়েছে। সবিনা তখন থেকে আর টাকা পাঠায় না। তবুও তার অনেক টাকার দরকার। এদিকে আয় কমে এসেছে।
" কি রে জুঁই বসে আছিস কেনে? এই লে নতুন মাল মনে হচ্ছে। দেখে নে। তবে আমার কথাটা ভুলিস না।"
জুঁই চোখ মুছে দরজাটা বন্ধ করে পাশে বসে গায়ে হাত দিতে যেতেই চমকে পিছিয়ে যায়। যেন সে একটা বৈদ্যুতিক ঝটকা পেয়েছে।
ছেলেটি জুঁইয়ের পায়ের হাত দিয়ে প্রণাম করে। জুঁই চমকে উঠে বলে "কি করছো ভাই?"
" কেউ চিনতে না পারলেও আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন দিদি আমি আপনার চোখ দেখে বুঝতে পেরেছি। দিদি আপনি না থাকলে আমি কোথায় ভেসে যেতাম কে জানে? এই নরকেই দালাল হয়ে জীবন কেটে যেতো। আজকে আমি আর্মিতে চাকরি পেয়েছি। আজ সকালেই Appointment letter পেলাম।ভগবানের মন্দিরে পুজো করার পরে ভাবলাম আমার দেবীকেও প্রণাম করে আসি।"
জুঁই অস্ফুটে বললো "দেবী!!!"
ছেলেটির কানে বুঝি কথাটা ঢুকেনি, সে নিজের মনেই বলতে থাকলো "আপনি আমার লেখাপড়া থেকে চাকরির প্রস্তুতি, Form fill up এর টাকা সব দিয়েছেন। আপনি বলেছিলেন এখানে আমি যাতে কখনো পা না দিই, আপনার কথা ভেঙেছি তা কিন্তু নয়, আমি নিজেকে কথা দিয়েছিলাম চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত এখানে পা দেবো না। চাকরি পেয়ে আমি আসবো আমার দিদির কাছে দিদির আশীর্বাদ নিতে।"
" ভাই রে এভাবে এলে.." বলে অস্ফুটে কেঁদে উঠে। অনলের আপন দিদি এখানেই কাজ করতে এসেছিল মা-ভাইয়ের জন্য, অবশ্য এখানে আসবাব আগে জানতো না যে এই নরকে এনে ফেলছে পাড়াতুতো কাকা, সেও আদতে একজন দালাল। অনল যখন মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয় সেবার অনলের মা মারা যায়। অনল কোনো পথ না পেয়ে এই নরকে এসে দাঁড়ায় সেই মানুষের হাত ধরে, যার হাত ধরে ওর দিদি এই নরকে এসেছিল। ওই দিদি আসল নাম ছিল অনিতা। এখানে এসে নাম হয় মালতী। ওর মা কিছুটা আন্দাজ করলেও বছর আটের ছোট ভাইকে কোনো দিনও জানতে দেয়নি ও কি কাজ করে। যখন ওর ভাই এসে দাঁড়ায়, লজ্জায় গলায় দড়ি দেয় মালতী। দরজা ভেঙে যখন বের করা হয় তখন অল্প অল্প প্রাণ রয়েছে, প্রাণের সখী জুঁইয়ের হাতে ভাইয়ের হাত তুলে দিয়েই প্রাণ হারায় মালতী। সদ্য মাতৃহারা অনল দিদিকে হারিয়ে কেমন হয়ে যায়, নিজেকে দিদির হত্যাকারী মনে করতে থাকে আর দিদির পেশার কথা জানতে পেরে ঘৃণা করতে শুধু করে প্রাণপ্রিয় দিদিটাকে। এখানকার কিছু দালাল ওকে নিজের দলভুক্ত করতে তালিম দিতে শুরু করে।।বাড়ির মালকিনের তাই ইচ্ছে, কারণ ওর দিদিকে টাকা দিয়ে কিনেছিল। সেটা অনলকে শোধ করতে হবে। জুঁই সবার চোখ এড়িয়ে যতটা পারে খেয়াল রাখে। একদিন সবার অলক্ষ্যে অনলকে কাছে ডেকে বোঝায় "অনল জানি তুমি আমাদের আর তোমার দিদিকে ঘৃণা করো। কিন্তু কেউ স্বেচ্ছায় এখানে আসেনা। সেসব না হয় ভিন্ন বিষয়, বড় হলে বুঝতে পারবে। তোমার দিদির তোমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। তাই সে তোমাকে এই নরকে সইতে পারেনি। তুমি এখান থেকে চলে যাও। স্কুলে ভর্তি হও। চাকরির চেষ্টা করো।আমি আছি তোমার জন্য। যা খরচ আমি দেবো।"
" না আমি আপনার কাছে থেকে কিছু নেবো না।"
" ধার হিসেবে নাও। ফিরিয়ে দিয়ো পরে। আমাকে ঘৃণা করো অসুবিধা নেই। টাকাটায় দোষ নেই সেটা নিও।"অনল গোঁজ হয়ে বসে থাকে। জুঁই অনলের গায়ে হাত দিতেই হাত সরিয়ে দেয়।
জুঁই রাগ না করে সামান্য হেসে বলে " অনল আমাদের প্রতি এই ঘৃণা বজিয়ে রেখো, কোনো দিনও এই নরকে পা দিও না। তোমরা যদি পা না দাও এই নরক তৈরি হবে না। আমার জন্য না হলেও তোমার দিদির জন্য নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করো। মেয়েটা তোমাদের জন্য এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করেছে।"সেদিন অনল কথা না বলে চলে যায়।অনেকদিনের সাধ্য সাধনার পরে রাজি হয় অনল। জুঁই শুধুমাত্র কথা আদায় করে এখানে যাতে কোনো দিনও না আসে। অনল কথা রেখেছিল, একবারও আসেনি এখানে। তারপর থেকেই অবশ্য জুঁই ওর জন্য টাকা পাঠিয়েছে। পরশু ফোন করেছিল হাজার টাকা দরকার form fill এর জন্য। কালকেই শেষ দিন, তাই আজকে টাকাটার জন্য মরিয়া ছিল।
" দিদি আপনি আমাকে অনেক দিয়েছেন, তবুও আপনার কাছে থেকে আমি একটা জিনিস চাইবো?"
জুঁই অবাক গলায় বলে "আমার কি দেবার ক্ষমতা? "
" আপনার ক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু.. "
" আচ্ছা বলো।"কথাটা শুনেই অনলের মুখ উজ্জ্বল হয়ে যায়।" দিদি আমি সাথে করে রাখি এনেছি। আজ রাখীপূর্ণিমা, আমাকে রাখী পড়াবেন? দিদি যতদিন বেঁচেছিল ভাইফোঁটা আর রাখীপূর্ণিমাতে ঠিক আমার কাছে যেতো। ও চলে যাবার পরে থেকে কেউ আমাকে রাখী পড়ায়নি ফোঁটা দেয়নি। আপনিও বারণ করেছিলেন এখানে আসতে। আজকের দিনটা আমার কাছে স্মরণীয় দিন। আজকে সকালের ডাকে Appointment letter পেলাম আর আজ আবার রাখীপূর্ণিমাও। পারলাম না নিজেকে আঁটকে রাখতে। চলে আসলাম আপনার কাছে, পড়াবেন আমায় রাখী?"
জুঁইয়ের চোখ জলে ভরে আসে। তারও দুই ভাই রয়েছে, তারা আয় করতে শেখার পরে চিঠি লিখে জানিয়ে দিয়েছিল যাতে আর সম্পর্ক না রাখে। তাতে নাকি ওদের মান যায়, আর স্বামী সন্তানদের কথা যত না বলা যায় ভালো। তবে ওর সবিনা সত্তা বাঁধা দিতে থাকে। ওদের ধর্মে এসব জায়েজ নয়।অনল জুঁইকে চুপ থাকতে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলে "দিদি বুঝি বেশি চেয়ে ফেলেছি, আমাকে ক্ষমা করবেন। আসি দিদি।" অনলকে চলে যেতে দেখে যেন সবিনা জুঁই সব পেরিয়ে দিদি সত্তা জেগে উঠে। বলে উঠে "ভাই যেও না। "গলায় এমন আঁকুতি ছিল যে থমকে দাঁড়িয়ে যায় অনল।
" ভাই আমি যে এসবের কিছু নিয়মই জানিনা। আমি যে মুসলমান। আমার হাতে রাখী পড়বে তুমি ভাই?"
" দিদি ভাইয়ের সম্পর্কে কখনো কি ধর্ম আসে? কোনো নিয়ম নেই। মন থেকে পড়াও।"
" না তা হয় নাকি? বসো আমি এক্ষুনি আসছি।"বলে পাশের ঘরে যায়। দেখে বাইরে থেকে দোর বন্ধ। কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমুঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে থেক্ব শেষের মাসির ঘরে গিয়ে প্রদীপ আর চন্দন চায়। মাসি অনেক কিছু জিজ্ঞেস করছিল, কিন্তু জুঁই এড়িয়ে যায়। সে কিছু বলতে না চাওয়ায়,বেশি কিছু জানতে আর সে চায়নি। পুরনো মানুষ।মাসির ঘর থেকে বেরিয়ে একটা ছেলেকে পাঠিয়ে মিষ্টি আনায়। মিনিট পনেরো পরে ফিরে এসে দেখে অনল তেমনি করেই বসে রয়েছে। জুঁই এসে আসন পাতে। মিষ্টিগুলো পাত্রে সাজিয়ে দেয়। "এসো ভাই।"তারপর কি ভেবে থমকে গিয়ে বলে। আর একটু অপেক্ষা করো। বলে একটা কাপড় নিয়ে বাইরে চলে যায়। আরও মিনিট পনেরো পরে সিক্ত চুলে পরিস্কার কাপড় পড়ে এসে যখন ঘরে আসে, তখন অনলের মনে হয় কোথায় পাপ? কোথায় অশুচি? যেন এক পুণ্যতোয়া মুর্তি।
সে হেসে সামনে বসে বলে "অনেক দেরি করিয়ে ফেললাম না ভাই? কি করি বলো তো, পরিস্কার না হয়ে কি করে এই পুণ্য কাজে হাত দিই?"বলে কপালে চন্দন পড়িয়ে হাতে রাখী পড়িয়ে দেয় অনলকে। অনল আবার প্রণাম করতে যেতেই জুঁই কেমন আড়ষ্ট হয়ে গিয়ে বলে "আমাকে প্রণাম করো না।"
অনল প্রণাম করতে করতে বলে " আপনাকে ছাড়া কাকে প্রণাম করব? " একটু থেমে অনল উসখুস করে বলে "দিদি আমি.. " বলে চুপ করে যাওয়াতে জুঁই বলে "কিছু বলবে ভাই?"
" দিদি আপনি আমাকে তুই বলবেন? "
" আমি তুই বলব তোমাকে!! "
" বলবেন না? দিদি বলত জানেন। খুব ইচ্ছে করে শুনতে।"
" হ্যাঁ ভাই কেন তুই বলব না? তবে আমাকে তুমি বলিস আপনি ছেড়ে। ভাই তুই আমাকে আজ যা সম্মান দিলি, তা..."
" না দিদি আমি কিছুই দিইনি নিয়ে গিয়েছি সব সময়।"
" আমরা যে নোংরা!! পাঁকের মানুষ। "
" আপনারা পাঁকের পঙ্কজ। আপনাদের নাম শুধু ফুল দিয়ে নয়, আপনারা হলেন অনন্য ফুল। যারা বাকি ফুলেদের অকালে ঝরা থেকে রক্ষা করেন। আপনারা অনন্য তা আপনারা জানেন না, আমরা জানি আপনারা এতোটাই অনন্য আপনাদের মাটি ব্যতীত দুর্গাপূজা হয়না। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ আর অনন্য ফুল আপনি। শেষ দিন পর্যন্ত আপনাকে মাথায় করে রাখবো। আর কিছুদিন সহ্য করেন, আপনার এই ভাই তার অনন্য ফুলকে মাথায় করে নিয়ে যাবে, তার ঈশ্বরের পায়ে সমর্পণ করতে।"
"ঠিকই বলছ ভাই এমন অনন্য একটা ফুল তোমার মতো দিদি হিসেবে যদি আমি পেতাম, তবে বুঝি আমিও এই নরক থেকে মুক্তি পেতাম।" এই কথা শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখে বল্টু এসে দাঁড়িয়েছে। চোখে সেই উগ্রতার পরিবর্তে কেমন শান্ত রূপ। সবার অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে বল্টু হেসে উত্তর দেয়
" অবাক হয়ে গিয়েছ আমার কথা শুনে তাই না? আসলে অনন্য ফুলের স্পর্শে এই রূপ পেয়েছি। ভাই তুমি চাকরিতে যোগদান করে এসো, নিয়ে যেয়ো নিজের মুকুট করে তোমার দিদিকে, আমি সাহায্য করব কথা দিলাম।"
~সমাপ্ত ~
25/07/2023
#জীবনযাপন (ষোড়শ পর্ব)
-শ্যামশ্রী কর্ম্মকার
" কি রে চুপচাপ বসে আছিস কেন? দেখ সামনের মাঠে সবাই খেলতে এসেছে যা।" বললো অয়নকে ওদের জ্যাঠাইমা।
অয়ন মাথা দুলিয়ে না বলে চুপ করে বসে রইলো। তেমনি করে চয়ন, নয়নও দাদার কাছ ঘেঁষে বসে রয়েছে। খুব কষ্ট লাগলো মিনতির। আজ প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলল তার কাছে রয়েছে ছেলেমেয়েগুলো। প্রথম প্রথম মায়ের খোঁজ করলেও এখন আর করে না। নিজে থেকে ঠিক সময় ঘুম থেকে উঠে, তৈরী হয়ে স্কুলে যায়৷ যা খেতে দেওয়া হয় খায়। অবশ্য চয়ন, নয়নের স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ বাচ্চা দুটোকে মনমরা হয়ে থাকতে দেখে দীপু, মানে ওদের জ্যাঠতুতো দাদা পাশের স্কুলে গিয়ে অনুরোধ করেছে যাতে ওর ছোট দুই ভাইবোনকে স্কুলে আসার অনুমতি দেয়। গ্রামের স্কুল থেকে অনুমতি পত্রও নিয়ে এসেছে। এসব করার একটাই কারণ সবার সাথে মিশে যদি মনটা ভালো হয়।
সুমতি পাশে এসে বসে গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। অয়ন যখন মাকে হারায় তখন তার কাছে ছিল বেশ কিছুদিন, আরতি এসে এমন করে ওকে বুকে তুলে নেয় মনে হয়েছিল সে যেন তার হারানো ছেলেকে ফিরে পেয়েছে। তারপর আরতি তার যা হয়ে গেল। সত্যিকারের অয়নের মা হয়ে উঠলো, তারপর ওর কোল জুড়ে এলো চয়ন, নয়ন। তার আগে অবশ্য কম অত্যাচার তাকে সহ্য করতে হয়নি, কিন্তু কোনো দিনও মুখ ফুটে কারো নামে নিন্দা করতে শোনেনি ও। সুমতির শ্বাশুড়ি এসে কম কথা শুনিয়েছিল তাকে। অভিশাপ দিতো হয়তো,কিন্তু সেটা করলে তার ছেলে আর নাতিদেরও ক্ষতি হতে পারে, তাই কথা শুনিয়েই ক্ষান্ত থেকেছে। আর বাড়িতে তিনি আরতির সাথে কি ব্যবহারটা করত, সেটা ভাবলেই খারাপ লাগতো সুমতির। কিন্তু সেই মানুষটাই একদম বদলে গেল,যে মানুষ আরতির মুখ দেখবেননা বলে বড় মেয়ের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। সেই মানুষই আরতিকে ছাড়া একদম থাকতে পারতেন না।আরতিও শ্বাশুড়িকে ছেড়ে তেমন কোথাও যেতো না। তবে ওর বড় মাসি বড় মেসো ওকে দেখে থাকতে পারতেন না দেখতে দিন কয়েক কাটিয়ে আসতো। ওদের শ্বাশুড়ি মাতাই জোর করে করে পাঠাতেন। আজও মনে পড়ে সেই দিনটি যেদিন জানতে পারলেন আরতি মা হচ্ছে, খুশীতে বুড়ি বড় ছেলেকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। বলেছিলেন " এবার আমার বান্ধবী আসছে। " উনার শ্বাশুড়ির খুব নাতনির শখ ছিল। চয়নের সময় ভেবেছিলেন নাতনি হবে। অবশ্য চয়নকে পেয়েও খুশী হয়েছিলেন, সুমতির বড্ড অবাক লাগে এই মানুষটাকে কি করে এতোটা বদলে দিতে পেরেছিল আরতি কে জানে। সুমতির সাথে শ্বাশুড়ির বনিবনা ছিল না এই মিথ্যা কেউ বলতে না পারলেও আরতির সাথে যে মা মেয়ের মতো সম্পর্ক হয়ে উঠেছিল, সেটা তারসাথে হয়ে উঠেনি কোনো দিনও। যদিও সুমতিকে পছন্দ করে বাড়ির বৌ করে এনেছিলেন তিনিই। আরতির ক্ষেত্রে তো পুরোই উল্টো বিষয় থাকার পরেও আরতি নিজের কাজ আর ব্যবহারের হাত ধরে সবটা বদলাতে পেরেছিল।তাই বুঝি নয়ন জন্মানোর পরে সবাই বলেছিল ওর শ্বাশুড়ি ফিরে এসেছে, ছোট বৌমাকে ছেড়ে থাকতে পারেন নি নাকি তিনি।
আর অয়ন নিজের মায়ের থেকে যতটা ভালোবাসা আদর যত্ন পেয়েছিল,সেটা হয়তো ওর জন্মদাত্রী বেঁচে থাকলেও করতে পারতো না।নিজের ছেলে মেয়ে হলে নাকি ভালোবাসা কমে যায়। কিন্তু আরতির ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। অয়ন ভালোবাসা পেয়েছে বড় সন্তান হিসেবে সবসময়। ও হয়তো জানেই না আরতি তাকে জন্ম দেয়নি বা জানলেও হয়তো বিশ্বাস করে না।
" কি রে কি হয়েছে? খিদে পেয়েছে? কিছু খাবি?"
একইভাবে মাথা দুলিয়ে জানালো যে পায়নি। নয়ন কত চঞ্চল, অয়ন, চয়নের দুষ্টুমি গুলোও যেন চলে গিয়েছে তাদের মায়ের সাথে,তারা যেন নিষ্প্রাণ। চোখে জল এসে যায় সুমতির। চোখ মুছে নেয় ওদের অলক্ষ্যে।
সুমতি উঠে যায়। কি বলবে? কি বলে বোঝাবে এদের? কোনো আশাই নেই আরতিকে ফিরে পাওয়ার। যে নিজে থেকে হারিয়ে যায় তাকে খুঁজে পাওয়া সহজ না।
সুমতি ঘর বাহির করছিলেন, সেই কোন সকালে ভোর ভোর থাকতে স্বামী গিয়েছে ভাইয়ের খোঁজ নিতে।মনটাও ভালো লাগছিল না। কেমন উতলা হয়ে রয়েছে। ঠাকুরের উদ্দেশ্যে বারকয়েক প্রণাম করেছে সে। অনেক বেলা করে অজিত বাড়ি ফিরলো। সাথে ছোট নন্দাই। তাই কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারলো
" তুমি হঠাৎ কি মনে করে? ভুল করেও তো এই পথে পা বাড়াও না।"
" সে শুষ্ক হাসলো।"
অজিত স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন " বলছি অয়নরা কোথায়? "
" ওরা ঘরে বসে ছিল, ওর দাদা এই মাত্র জোর করে সামনের মাঠে নিয়ে গেল। কেন ডেকে পাঠাবো?" বলে বাড়ির সময়ের ঝিকে ডাকতে যেতেই অজিত বললো " না ওদের ডেকো না। বরং ক্ষেন্তিকে বলো জল গরম বসাতে।"
সুমতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন " তুমি গরম জলে স্নান করবে?"
" আমি না তপনের জন্য বললাম, অবশ্য আমিও করে নেবো ভাবছি" তারপর যেন নিজের মনেই বললেন "শরীরটা ঠিক রাখতে হবে অনেক দায়িত্ব আমার। "
সুমতি বললো " কি গো কি বলছো?"
তপন পাশে ছিল কথাটা শুনেছে, তাছাড়া ও জানে অজিতের মনের অবস্থার কথাটা।
" বৌদি বলছি আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।"
সুমতি স্মিত হেসে বলল " বারে কি এমন বলবে তপন যে সংকোচ করছো।"
কিন্তু সুমতির মনটা স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে আরও বেশি কু ডাকছিল। তাই সে নিজের মনের চিন্তাকেই দূরে ঠেলতে সহজ করে কথা বলছিল।
তপন কিছু বলার আগে অজিত বারান্দায় বসে পড়ে খুঁটিতে হাত দিয়ে বলে উঠে "সুজিতের অবস্থা খুব খারাপ, কি হবে বুঝতে পারছি না গো। কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।"
সুমতি স্বামীর পাশে বসে পড়লো। কি শুনছে ও। তবে কথাটার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারলো না। ওর মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো। খালি বাচ্চাদের মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
অজিত ধীরে ধীরে সব কথা বলতে শুরু করে। সুমতি সব শুনে মাথায় হাত দিয়ে বসে রয়। ভুলেই যায় তপনকে বসতে বলতে।
এমন সময় বাচ্চাদের দরজার কাছে বাচ্চাদের দেখা যায়। কখন এসেছে তারা জানে না। নয়ন এগিয়ে এসে বলে "বম্মা কি হয়েছে তোমার? শরীর ভালো লাগছে না?"
দুইভাই বোনের পিছু পিছু এসে দাঁড়িয়েছে আর ওদের জ্যাঠতুতো দাদা ছোট পিসোমশাইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে জিজ্ঞেস্য মুখ নিয়ে।
সুমতি কিছু না বলে ছেলেমেয়েগুলোকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে কেঁদে উঠলেন। আজকে নিজেকে এতোটাই অসহায় লাগছে নিজেকে এতোদিন সংযত রাখলেও আজ আর পারলোনা। মনে মনে বললো " আরতি ফিরে আয়, ফিরে আয় বোন, নইলে সব ভেসে যাবে। "
বম্মাকে কাঁদতে দেখে ওরা অসম্ভব ভয় পেয়ে গেল, একেই ভয়ে সিঁটিয়ে ছিল। চয়ন কেমন একটা ঘোরের ভঙ্গিতে বললো " মা নেই তাই না বম্মা, আমার বন্ধু রাঁধাও যখন মরে গেছিল তখন ওকেই কেউ প্রথমে বলেনি। ওর দিদাও নাকি তোমার মতো কাঁদত। "
সুমতি এবারে অসম্ভব চমকে উঠলো। তারপর নিজের সংযম হারানোর জন্য নিজেকেই শাসন করলো। "পাগল হলি নাকি সুমতি, বাচ্চাগুলোর তোরা ছাড়া কেউ নেই। ওদের কথা ভাববি না?"
তারপর নিজের চোখ মুছে চয়নের গালদুটো টিপে বললো " পাকা বুড়ো, কে বললো তোকে এসব কথা। কিছু হয়নি তোর মায়ের, তোদের মায়ের জন্য মন খারাপ হয়, আমার হয়না বুঝি।তোদের মতো তো আমিও ওকে কতদিন দেখিনি। তুই বুঝি জানিস না তোর মা আমার বোন হয়।"
অয়ন দুই হাতে দুই চোখ মুছে এতোক্ষণ পরে বললো " আমি জানি মায়ের কিছু হয়নি, রাগ করে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে, ঠিক ফিরে আসবে, এবার ফিরলে আর দুষ্টুমি করবো না,সব কথা শুনে চলব মায়ের।"
এবারও চোখে জল এসে গেছিল সুমতির। কিন্তু সবার চোখের আড়ালে চোখ মুছে নিয়ে বললো " ঠিক ঠিক, অভিমান তো করতেই পারে " তারপর ছেলেকে ইশারায় ওদেরকে বাইরে নিয়ে যেতে বললেন, এখনো সবটা জানা হয়নি.."
" চল ভাই বুনু ছোট পিসোমশাই এসেছেন মিষ্টি কিনে আনি। "
অয়নরা এগিয়ে গেল দাদার কথা শুনে, ইচ্ছা ছিল না ওদের তা দেখেই বোঝা গেল। কিন্তু বড়দের কথা ওরা কখনো না শোনা করে না। একবার পেছনে সবার দিকে তাকিয়ে ওরা দাদার হাত ধরে বাইরে বেড়িয়ে গেল...
চলবে...
29/06/2023
#জীবনযাপন
পর্ব-পঞ্চদশ
দিন তিনেক হলো নিজের গ্রামে ফিরে এসেছে সুজিত। ছেলে মেয়েদের ওদের বম্মা ছাড়েনি, সুজিতকেও আসতে দিতে চাইছিল না। জোর করে এসেছে। যদি আরতি বাড়ি ফিরে আসে, তাদের দেখতে না পেয়ে আবার চলে যায় যদি। তাই চলে এসেছে সুজিত জোর করে। তার আগে অজিত ভাইকে নিয়ে গিয়ে পুলিশে ডাইরি করে এসেছে। বাড়িতে আসার পরে থেকে বের হয়নি একবারও, আরতিকে অবিশ্বাস করার জন্য মরমে মরে যেতে থাকে সে।
অজিত এই তিনদিন আসতে পারে নি,হাট ছিল তিনখানা। তাই আজ সকালে উঠেই চলে এসেছে গ্রামের বাড়িতে।এখন বেশ ঠান্ডা পড়েছে, খুব না। সকালে সূর্য উঠেছে, তবে তাপ নেই তেমন। অজিত যখন আসছিল হালকা কুয়াশার পর্দা ছেয়ে রেখেছিল চারপাশে। বেশ লাগছিলো দেখতে। অজিতের ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। খেজুরের রস এদিকে খুব পাওয়া যায়।প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই হয়।তবুও অজিত আর সুজিত মিলে গাছে উঠে খেজুরের রস চুরি করতে যেতো। সুজিত শান্ত ছিল তার তুলনায়। আর ছোট ছিল দেখে সে নীচে দাঁড়িয়ে পাহারা দিত আর গাছে উঠে হাড়ি পাড়তো অজিত। কি জীবন ছিল সেটা। সেজন্য কম মার খায়নি। তবুও বন্ধ করতে পারেনি যতদিন না নিজে থেকে বন্ধ করেছে সে। অবশ্য অজিতের বাবা খেজুরের রসের ব্যবসা করতেন না। উনার হাতের তাক তেমন ভালো ছিল না। তবে বাড়ির খাবার জন্য অল্প করে করতেন। ছোটবেলার কথা মনে পড়লেই ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠে যে কোনো মানুষের, সেটা বছর কুড়ির কিশোর হোক কিংবা বছর পঞ্চাশের প্রৌঢ়র। অনেক দিন বুকটার মধ্যে একটা পাথরচাপা হয়েছিল যেন।আবাল্য পরিচিত পরিবেশে এসে মন কিছুটা হালকা হলো অজিতের।
বাড়িতে ঢুকেই মনের শান্তিটা যেন কর্পূরের মতো যেন উবে গেল, মনে হলো যেন পরিত্যক্ত কোনো বাড়িতে এসেছে সে।আগেরবার এসে বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়ার সময় যে হতশ্রী দশা দেখেছিল,আজ তার চেয়েও খারাপ। একটা কথা আজ সে অনুভব করলো, কেন মেয়েদের বাড়ির লক্ষ্মী বলা হয়, নারীদের কোনো বাড়ি নেই, কিন্তু নারীদের ছাড়াও বাড়ি হয়না।
অজিত চারিদিক একবার দেখে নিয়ে দেখলো, বাড়ির একটা দরজাই খোলা। সে সুজিতের নাম ধরে ডাকবে ভেবেও কি মনে হতে, সোজা ঘরে গিয়ে ঢুকে। ঘরে পা দিতেই চোখ পড়ে দেখে সুজিত কেমন যেন অপ্রকৃতস্থ ভাবে শুয়ে রয়েছে।কাছে এগিয়ে গায়ে হাত দিতেই চমকে উঠে, বুঝতে পারে জ্বরে অচৈতন্য সে।গায়ে ধুম জ্বর। কয়েক সেকেন্ড ভেবেই বাইরে বেড়িয়ে আসে, বাড়ির বাইরে এসে কোনো মতে একটা ভ্যান জোগাড় করবে ঠিক করে। কপালটা একটু হলেও ভালো বাড়ি কাছে যার ভ্যান রয়েছে, সে এখনো বাড়িতে। হয়তো শীতের জন্য, সুজিতের অসুস্থতার কথা বলতেই সে বিছানা ছেড়ে ভ্যান নিয়ে বেড়িয়ে যায়। গ্রামের মানুষদের শহরের মতো সুবিধা নেই,একে অপরের ভরসায় বাঁচে। তাই একে অপরের বিপদে ছুটে আসে।
দুইজনে ধরে ধরে ভাইকে ভ্যানে শোয়ায়।ভালো করে কম্বল দিয়ে ঢেকে দেয় সুজিতকে ।তারপর ভ্যানকে নির্দেশ দেয় হাসপাতালের দিকে এগোতে। ঘরে এসে নিয়ে নেয় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। দরজায় তালা লাগিয়ে সাইকেলে উঠে যতটা সম্ভব জোরে সাইকেল চালায়। মনে মনে বলে "আর দেরী হলে ভাইটাকে বাঁচাতে পারতাম না, এখনো কি হয় কে জানে? "
হাসপাতালে যাওয়ার পথে ছোট বোনের বাড়ি পড়ে। পথে দেখা বোন জামাইয়ের সাথে, সে বাড়ির কাছের মোড়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল সমবয়সী ককয়েকজনের সাথে।অজিতকে দেখে এগিয়ে যায় সে।
"আরে দাদা আপনি এদিকে। গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন বুঝি।"
" হ্যাঁ ভাই, তা এখন আসি।"
" এতো তাড়াহুড়ো কিসের, চলুন বোনের সাথে দেখা করে যাবেন, বাড়ির সামনে থেকে চলে গিয়েছেন শুনলে সুমি খুব কষ্ট পাবে।"
অজিত বোঝাবার সুরে বললেন " না ভাই আজ হবে না। ওই দেখো সুজিত ভ্যানে করে আসছে। গিয়ে দেখি ধুম জ্বর। ওকে নিয়ে যাচ্ছি।"
" কি বলছেন, তা ছোটবৌদি কই? এলো না সাথে? "
অজিত বুঝতে পারলো জানেনা আরতির ঘটনাটা। সে কিছু বলার আগে ভ্যানটা কাছে চলে এসে পাশ কাটিয়ে গেল। "ভাই এখন আসি। ছোটকে বলে দিও।"
" দাঁড়ান আমিও যাব আপনার সাথে, এখুনি বাড়িতে জানিয়ে আসছি।"
অজিত নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। অবশ্য মিনিট পাঁচেকের মধ্যে চলেও আসলো, অজিত দেখলো অনতিদূরে ছোট বোন উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে। অজিত হাত তুলে বললো "চিন্তা করিস না ছোট, আমরা আছি সব ঠিক হয়ে যাবে।"
আর কথা না বাড়িয়ে দুইজনে সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখল। ছোটবোন সুমিতা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কপালে হাত ঠেঁকালো সেটা অজিতের দৃষ্টি এড়ালো না।
হাসপাতালে পৌঁছে ভর্তি করাতে খুব বেগ পেতে না হলেও ডাক্তার জানালো সুজিতের পরিস্থিতি ভালো নয়। যদি আজ জ্বর না কমে সদর হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। অজিত এসে মাথায় হাত দিয়ে বসলো।
তপন অজিতের পাশে বসে বললো "এতো চিন্তা করবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে।"
অজিত তপনের হাত দুটো ধরে বললো "সুজিতকে বাঁচাতেই হবে, নইলে ছেলে মেয়েগুলো অনাথ হয়ে যাবে। "
তপন চুপ করে বসে রইলো অজিতের পাশে, কি বলবে ও? পরিস্থিতি সত্যি কঠিন।
কিছুক্ষণ পরে বললো "দাদা ছোট বৌদিকে তো একটা খবর দিতে হয়। চিন্তা করছেন উনি।"
অজিত এবারে ফাঁপড়ে পড়লো। এতোক্ষণ চুপ করে ছিলেন, ভেবেছিলেন বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন। আত্মীয়দের জানানোর ইচ্ছে ছিলো না। অতিরঞ্জিত করে চারিদিকে ছড়িয়ে যাবে।তাছাড়া বলার মতো বিষয় না এটা। কি বলবে? সুজিত অকারণে ভুল বুঝে আরতিকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তখন এরা বলবে তাড়িয়ে দিলেই চলে যেতে হবে?পায়ে ধরে দাঁত চিপে থাকতে হয়, মেয়েমানুষ না? সহ্য করতে হবে না? এসব কথা আরতির বিষয় শুনতে ভালো লাগে না অজিতের। সে আরতিকে চেনে। আরতির জন্যই সুজিত প্রকৃত সংসারসুখ কি বুঝেছিল। আর আরতিকে আজ পর্যন্ত দেখেনি কোনো দিনও সংসারের কোনো কর্তব্যের দিকে মুখ ফেরাতে।
অজিতকে চুপ থাকতে দেখে কথাটি আবার বললো তপন। "দাদা, খবর পাঠাতে হবে যে.. "
অজিত দেখলো এবার বলতেই হবে, তাই সে ছোট্ট করে একটা শ্বাস ছেড়ে বললো "কার কাছে খবর পাঠাবে?"
" কেন ছোট বৌদি বাড়ি নেই? বাপের বাড়ি গিয়েছে বুঝি? তাহলে তো সেখানেই খবর পাঠাতে হবে। দাদার যা অবস্থা দেখছি।উনাকে জানানো প্রয়োজন।"
অজিত তপনের ঘাড়ে একটা হাত রেখে বললো " আরতি কোথায় আমরা জানিনা ভাই, আমার ভাইটা তাকে ভুল বুঝে এমন অপমান করেছিল সে অভিমানে বাড়ি ছাড়া হয়েছে। "
তপন প্রায় আৎকে উঠে বললো " কবে?"
" তিন সপ্তাহের উপর হতে চললো ভাই। অভাগী কি আদেও বেঁচে রয়েছে। বেঁচে থাকলে কি এমন করে দূরে সরে থাকতে পারত?"
তপন হিসেব করে দেখলো সেসময়ই সুজিত এসেছিল তাদের বাড়ি।
তপন বললো "বৌদির বাপের বাড়ি খোঁজ নিয়েছেন?"
" হ্যাঁ সুজিত গিয়েছিল, এই তো ফিরলো সেখান থেকে। "
তপন বিরস মুখে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বল্লো "বাচ্চারা কোথায়? গ্রামের বাড়িতে? "
" না না, আমার কাছে এনে রেখেছি। ওদের বম্মার কাছে আছে।"
" দাদা আমাদের এতো পর করে দিলেন আপনারা? কিছুই জানালেন না।"
" না ভাই তা নয়, কাউকেই জানায়নি। আসলে আমি চাইনি আরতির মতো মেয়ের নামে কেউ কিছু বলার সুযোগ পাক।"
" দাদা আপনি জানেন না বৌদি আমার কাছে কতটা সম্মানের, উনার নামে কলঙ্ক রটে, এমন কিছু আমি মরে গেলেও করতে পারবো না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, কেউ কিছু জানবে না।" মনে মনে বললো
" দাদা আপনি জানেন না বৌদি আমাকে কি উপহার দিয়েছেন, আজ আমি সন্তানের পিতা উনার জন্যই। আমার সংসার ভাঙ্গা থেকে বাঁচিয়েছেন। সুমিকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করেও কিছু লাভ হতো না। দোষটা আমার মধ্যে ছিল। সবাই একদিন ঠিক জেনে যেতো।সেটা যে কোনো পুরুষের ক্ষেত্রে কতটা লজ্জার আমি জানি। উনার পরামর্শতে চিকিৎসা করে আমি সন্তান সুখ পেয়েছি।"
" তপন কি ভাবছো?" জিজ্ঞেস করলেন অজিত।
তপন সামান্য চমকে উঠে বললো "তেমন কিছু না দাদা। ভাবছি আপনার বোনকে কথাটা জানানো ঠিক হবে কিনা."
" এখন না জানানোই ভালো। "
" হু।" বলে সম্মতি জানালো তপন। তপন আরতির কাছে কৃতজ্ঞ আরও একটি কারণে সুমির গৃহত্যাগ থেকে শুরু করে, বাকি ইতিহাস আরতি গোপন রেখেছিল সবার থেকে। অজিতও যে কথাটা জানেনা তা জানে তপন। জানলে বিষয়টা খুব খারাপ হতো। কারণ পারিবারিক সম্পর্ক গড়ার আগে থেকেই তপনের বড়দা স্বপনের সাথে গভীর বন্ধুত্ব। সেটাই অবশ্য তাদের বিয়ের কারণ।
একজন নার্স প্রায় এসে জানালো "সুজিতের বাড়ির লোক কে?"
অজিত ভীরু মুখে তপনের দিকে তাকালো। তপন অজিতের হাতে হালকা চাপ দিয়ে এগিয়ে এসে বললো " আমরা "
" আপনাদের রোগীর অবস্থা ভালো নয়। কয়েকটি ওষুধ দিচ্ছি নিয়ে আসুন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আর হ্যাঁ আরতি কে? উনাকে তাড়াতাড়ি আনানোর ব্যবস্থা করেন। রোগী উনাকে খুঁজছেন। উনি আসলে হয়তো রোগী ভালো হয়ে যেতেও পারেন।"
অজিত আবারও মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে, প্রায় ডুকরে কেঁদে উঠে বলেন " তপন আমার ভাইটাকে বুঝি বাঁচাতে পারলাম না, আরতি কোথায়? কোথা থেকে পাবো ওকে।"
তপন কি করবে বুঝতে পারলো না, ওষুধ আনবে, না অজিতকে সামলাবে। মানুষটা যে এক্কেবারে ভেঙে পড়েছে বুঝতে পারলো সে।
সে শান্ত করার জন্য বললো " দাদা ধৈর্য্য ধরেন, ধৈর্য্য না ধরলে চলে? জীবনে কত কঠিন পরিস্থিতি আসে। আপনি একটু বসুন আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে ওষুধগুলো নিয়ে আসি।"
অজিত মাথা দুলিয়ে বললো "যাও ভাই যাও, ভাগ্যিস তুমি এসেছিলে।নইলে আমি কি করতেম কে জানে.."
তপন এক দৌড়ে বেড়িয়ে গেল। অজিত সে পথের দিকে কেমন একটা ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
চলবে...
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Website
Address
Kolkata
