Kolkata - কলকাতা

Kolkata - কলকাতা

Share

Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Kolkata - কলকাতা, কলিকাতা/কোলকাতা/Kolkata, KOLKATA.

02/04/2026
21/02/2026

সবাই একটু সময় নিয়ে পড়ো
#শেষ_অধ্যায় #ঈপ্সিতা_মিত্র

" দেখলে তো তোমার মা আজকে কি সিনটাই না ক্রিয়েট করলো ! ইশ , কোনো মানে হয় | এইসব ফাইভ ষ্টার হোটেল এ ডিনার করতে কেউ কখনো নিয়ে যায় ওই রকম একটা ইললিটারেট মহিলা কে ! " ... রাগে গজগজ করতে করতে কথাগুলো বললো মল্লিকা | আজকে পারদ খুব চড়েছে | পার্থ তাই মিনমিন করে উত্তর দিলো , ----- " আমি কি করবো ? তাতান জেদ করলো বলেই তো নিয়ে যেতে হলো | আফটার অল আজ ওর বার্থডে !" ...
কথাটা শুনে মল্লিকার পারদ আরোও চড়লো , সঙ্গে গলার রেঞ্জ ও , ------ " হোয়াট ডু ইউ মিন ... এখন যদি জন্মদিনে তোমার ছেলে বলে যে বাবা যাও , গিয়ে গঙ্গায় ঝাঁপ দাও, তুমি দিয়ে দেবে ?" ... প্রশ্নটা শুনে নীরবতা পালন করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না পার্থর | ... তবে মল্লিকা আর নীরব থাকলো না , বলেই চললো , ------- " কি করতে যে বাবা মার্ কথা না শুনে তোমার মতন একটা অঁজ পাড়াগাঁর ছেলেকে বিয়ে করলাম কে জানে ! লোকে এমনি এমনি তো বলে না, ফ্যামিলি , কালচার , ক্লাস এর কথা | কারণ আছে | আজ বুঝছি | তোমার মতন একজন এতো বড়ো গাইনোকোলজিস্ট এর মা যে এ ফর এপেল ও জানে না সেটা কেউ বাইরে থেকে দেখে বুঝবে ! ইশ , আজকের পার্টিতে আমার সব অফিস কলিগস , কলেজ ফ্রেন্ডস , রিলেটিভসরা এসেছিলো ! কি ভাবলো আমাদের ব্যাপারে ! আই ফেল্ট সো ইনসালটেড !".... এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে মল্লিকা এবার থামলো দম নেয়ার জন্য | তখনি ঘরের দরজায় টোকা | ভাঙা গলায় খুব আস্তে সে জিজ্ঞেস করলো , -- " বাবু আসবো ?" ........
এতক্ষন যার জন্য বাবুকে ফ্যামিলি আর ক্লাস নিয়ে এতো কথা শুনতে হলো , সেই মহিলাকে হঠাৎ চোখের সামনে দেখে বাবুরও মাথাটায় আগুন জ্বলে উঠলো , বেশ দাঁত মুখ খিঁচিয়েই ডক্টর পার্থ বসু তাঁর মা কে বলে উঠলো , ----- " এতো সব ব্যাপারে ন্যাকামি করো কেন বুঝতে পারি না | চলেই তো এসেছে ঘরের মধ্যে , এখন পারমিশন নেয়ার কি কোনো মানে আছে ! ওহ , সরি , তুমি তো আবার পারমিশন এর মানে বুঝবে না | বলছি অনুমতি নেয়ার কি কোনো দরকার আছে ?"....
কথাটা শুনে দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটা থতমত খেয়ে গেলো, তারপর কোনো মতে কথা সাজিয়ে আমতা আমতা করে বললো, ---
" না, আসলে প্রেসারের ওষুধটা শেষ হয়ে গেছে দু দিন হলো | তুই কি একটু এনে দিতে পারবি ?"
" পারবো না | কি করবে ! এন্ড আই ডোন্ট থিঙ্ক যে তুমি এতো সহজে পরলোকে যাবে | আমার লাইফটাকে হেল না করে তো তোমার যাওয়া হচ্ছে না |" ........
কথাটা শুনে এবার মল্লিকা বলে উঠলো , ------ " থাক পার্থ , আমাকে শুনিয়ে আর মা কে শাষণ করতে হবে না | যতটা ইনসাল্ট হওয়ার তো হয়েই গেছে ওনাকে পার্টিতে নিয়ে গিয়ে | এখন বাড়িতে এসে এই সিন্ ক্রিয়েট আর পোষাচ্ছে না |"...এরপর আর মল্লিকা ওই ঘরেই থাকলো না, খাটের ওপর রাখা বালিশটা তুলে পাশের ঘরে শুতে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো | পার্থ বুঝলো এটা ওর পানিশমেন্ট | এখন এই ঝামেলা , অন্য ঘরে শোয়া , দরকার ছাড়া কথা না বলা চলবে প্রায় সাত দিন | ব্যাপারটা ভেবেই আবার ছড়ানো ছেটানো রাগটা এসে জমা হলো দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মা এর ওপর, --------- " সব তোমার জন্য হলো | তুমি বোঝো না তুমি আমাদের সোসাইটিতে মেশার মতন মানুষ না ! আমি বললাম আর তুমি নাচতে নাচতে চলে গেলে হ্যাংলার মতন ! তুমি তো তাতানকে মিথ্যা বলতে পড়তে যে তোমার শরীর খারাপ | তাহলেই তাতান আর জেদ করতো না | কিন্তু না, সব সময় আমাকে সব জায়গায় লজ্জা দিতেই হবে | জাস্ট কিছু বলার নিয়েই |"....... কোনো পজ না নিয়ে কথাগুলো বলা শেষ করেই ধাম করে পার্থ মা এর মুখের ওপর দরজাটা দিয়ে দিলো | মলিনাদেবীর হঠাৎ চারিদিকটা ঝাপসা হয়ে এলো | চোখে বড্ডো জল জমেছে | সত্যিই কি উনি হ্যাংলা ! জন্মদিনে নাতির মুখের ওপর না বলতে পারেনি, মিথ্যা কথা সাজিয়ে গুছিয়ে বলতে পারেনি তাই উনি হ্যাংলা ! প্রশ্নগুলো বার বার মনে ভিড় করতে থাকলো | আর চোখে ভেসে উঠলো পার্টিতে আসা লোকগুলো হাসি হাসি মুখ | সবাই হাসছিলো ওনাকে দেখে, মজা নিচ্ছিলো একজন গাঁইয়ার |
আসলে সেইদিন পার্টিতে সব কন্টিনেন্টাল ডিশ হয়েছিল | পাস্তা, পিজা , নুডলস , মেক্সিক্যান কারী , পানির পাসান্দা এই সব | যেই সব খাবার চোখে দেখা তো দূরে থাক , নাম ও শোনেনি কখনো মলিনাদেবী | তাই বৌমা যখন তাঁর হাই ক্লাস সোসাইটির ফ্রেন্ডসদের সঙ্গে হাই হ্যালো করছিলো তখন মলিনাদেবী সবার সামনেই বৌমাকে প্রশ্ন করে ফেলেন , ----- " বৌমা বলছিলাম কি বেগুন ভাজা, সোনামুগের ডাল , ছ্যাচড়া এইসব কিছু হয়নি ? ওই শুঁয়ো পোকার মতন ঐগুলো টেবিলে কি সাজানো আছে ? ঐগুলো লোকে খেতে পারে না কি !" ...
ব্যাস, কথাটা শুনেই মল্লিকার মুখ লাল , লজ্জায় | আসে পাশের সবাই তো যেন লাফটার শো দেখার মতন হো হো করে হেঁসে উঠলো | পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মহিলা হাসি মুখেই বলে উঠলো , ----- " আন্টি আর ইউ আউট অফ ইওর মাইন্ড ! আপনি কি বলছেন এইসব ?" ......
মলিনাদেবী বোকার মতন মুখ করে আর একটা প্রশ্ন করে ফেললো , ---- " আংটি ! মা তুমি আমাকে আংটি বলে কেন ডাকছো ? আমি তো তোমার মাসিমা হই |".....কথাটা শেষ হতেই মল্লিকা সবার সামনেই চিৎকার করে উঠলো , --------" আপনি থামবেন মা | জাস্ট স্টপ ইট, প্লিজ .." ... কিন্তু ততক্ষনে যা হবার তা হয়ে গেছে | পুরো পার্টিতে ইনভাইটেড গেস্টরা তখন মুখ টিপে টিপে হেসে মজা লুঠছে | মল্লিকার মাসি তো আবার ওকে সরাসরি বলেই ফেললো , ----- " লিভ ইট মল্লিকা , উই আন্ডারস্ট্যান্ড , তোর হাজবেন্ট জুয়েল হলেও ফ্যামিলিটাকে ভালো চুজ করতে পারিসনি | মিনিমাম সেন্স ও কাজ করে না ভদ্রমহিলার | একে নিয়ে এইসব জায়গায় আসাটা তোদের উচিত হয়নি একদম |" ... সেইদিন কথাটা যেন তীরের মতন এসে বিঁধেছিল মল্লিকাকে | আর তার রেশ চলেছিল সাত দিন | পার্থর সঙ্গে কথা বন্ধ , বাড়িতে রান্না বন্ধ , আর শাশুড়িমাকে চোখের সামনে দেখলেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠা | শেষের উপসর্গটা এই সাত দিন পার্থরও হয়েছে | মা এই কদিন যতবারই কথা বলতে এসেছে পার্থর মুখ ঝামটা ছাড়া আর কিছুই ফিরিয়ে দিতে পারেনি | এই যেমন সেইদিন বাড়ির কাজের লোক আসেনি | মল্লিকা রাগের ঠেলায় সকাল সকালই অফিস বেরিয়ে গেছে , লাঞ্চ করবে ক্যান্টিনে | কিন্তু পার্থ তো কখনো না খেয়ে বেরোয় না , তাই মলিনাদেবী নিজেই চলে গিয়েছিলো রান্না ঘরে | হাতে তেল মেখে এঁচোড় কেটেছিল | ছোটবেলায় ছেলেটার এঁচোড়ের ডালনা খুব পছন্দ ছিল , যখনই রান্না করতো ওকে এসে জড়িয়ে ধরতো খুশিতে | এইসব ভেবেই ডাইনিং টেবিলে পার্থর জন্য এঁচোড়ের ডালনা সাজিয়েছিল বাটিতে | কিন্তু আজকের দিনটা একটু আলাদা হলো | পার্থ এলো , নির্বিকার মুখে খেলো , তারপর হাত ধুতে উঠে গেলো | মলিনাদেবী কিছুই বুঝতে পারলো না , তাহলে কি রান্নাটা খারাপ হয়েছে ! নুন ঝাল ঠিক আছে তো ! এইসব ভাবনার ভিড়েই আনমনে প্রশ্নটা করে ফেললো , ----- " এঁচোড়ের ডালনাটা ঠিক ছিল রে ? " ...... পার্থ কথাটা শুনে ভ্রুটা কুঁচকে বললো , ---- " মানে ? ভুল থাকবে কেন ?" ......... মোলিনাদেবী থমথমে মুখে বললো , ----- " না , আসলে তুই তো কিছু বলি না, তাই |"
পার্থ তখন বেশ ঝাঁঝিয়ে উত্তর দিলো , ------- " কাজ গুলো করো কি নাম কেনার জন্য ? কি ভাবলে এই সব রান্না করে খাওয়ালেই সেইদিন ইনসাল্ট টা ভুলে যাবো | তোমার জন্য মল্লিকার সঙ্গে আমার সম্পর্কটাতে এতো ঝামেলা ! সাত দিন ধরে আমরা কথা বলছি না | সেইসব এই এঁচোড়ের ডালনা খেয়ে ভুলে যাবো ?".... মলিনাদেবী এইসবের পর কি বলবে বুঝতে পারছিলো না | সত্যি এরপর কিছু বলার থাকে না | শুধু চোখ দুটো আবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে , জলে | অনেক চেষ্টা করেও চোখদুটোকে রুক্ষ শুস্ক রাখতে পারছে না | সেটা দেখে পার্থ গলার রেঞ্জটা আরও বাড়িয়ে বললো, --- " মা প্লিজ, এই মেলোড্রামাটা বন্ধ করো | এইসব ন্যাকামি আর সহ্য হচ্ছে না |" ......... না, মলিনাদেবী এই কথাটারও কোনো উত্তর দেয়নি | কারণ সামনে যে দাঁড়িয়ে এইসব কথা বলছে তাকে উনি চেনেন না | এই পার্থ একদম অচেনা | ওনার নিজের ছেলে আজ অনেক দূরের লোক , যাঁকে দূর থেকে দেখা যায় , কিন্তু সে ধরা ছোঁয়ার বাইরে |
এইসবের পর সাত দিন কেটে গেছে | আজ একুশে ফেব্রুয়ারি , ভাষা দিবস | তাতানদের স্কুলে আজ প্রোগ্রাম আছে | বাংলা ভাষা আমাদের বাঙালিদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা নিয়েই বক্ত্বব্য রাখা হবে | বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের কাছে বাংলা ভাষা কি , সেটা নিয়ে একটা আলোচনা ও হবে | আর কিছু স্টুডেন্টস স্পিচ দেবে মাতৃভাষা সম্পর্কে | তার মধ্যে তাতানও একজন | ক্লাসে ফার্স্ট হয় বলে স্কুল ওর নামটা সবার আগে সিলেক্ট করেছে | এখন ওর ক্লাস এইট | কিন্তু ওর রেসাল্ট দেখে সবাই বুঝে গেছে, এই ছেলে ভবিষ্যৎ এ ডাক্তার ই হবে বাবার মতন | এতো সেন্স অফ হিউমার , নলেজ এই বয়সে অনেকের মধ্যেই দেখা যায় না ! গাড়িতে বসে বসে মল্লিকা এইসব কথাই ভাবছিলো আর মুখটা গর্বের হাসিতে ভরে উঠছিলো মাঝে মাঝে | ফাংশনটা দুপুর ১২টা থেকে শুরু | ওরা তাই একটু আগে আগেই বেরিয়েছে | তাতান এতো এতো লোকের সামনে স্পিচ দেবে আজ | মল্লিকা তাই ভাষা দিবসের ইতিহাস কাল রাত দুটো অব্দি জেগে জেগে ছেলেকে মুখস্ত করিয়েছে | পার্থ ও আজ বেশ এক্সাইটেড | নিজের সব কাজ ফেলে আজ ও এসেছে স্কুলে | ছেলের স্পিচ ভিডিও রেকর্ডিং করবে , তারপর কলিগসদের শোনাবে | এইসব ভাবনার ভিড়েই ওদের গাড়িটা স্কুলের সামনে এসে থামলো | অডিটোরিয়ামের ফার্স্ট রো তে ই ওদের সিট্ টা রিসার্ভ করা ছিল | পৌঁছনোর পনেরো মিনিটের মধ্যেই অনুষ্ঠান শুরু হলো | রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরই তাতানের স্পিচ | পার্থ সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলের ভিডিও ক্যামেরা অন করে রেডি | লোকের ভিড়ে ঠাসা অডিটোরিয়ামটার স্টেজে যখন ছেলেকে উঠতে দেখলো , তখন আপনাআপনিই ওর মুখে একটা হাসি চলে এলো | কি স্পিচ দেবে তাতান ? ভাষা দিবস নিয়ে ও কি বলবে ? একরাশ ভাবনা এসে ভিড় করলো পার্থর মনে, আর তখনি তাতান বলতে শুরু করলো ,
" আজ একুশে ফেব্রুয়ারি | আজ ভাষা দিবস | ১৯৫২ সালে আজকের দিনেই বাংলা ভাষা বলার জন্য কিছু মহান প্রাণ আন্দোলন করে পুলিশের গুলি বুকে নিয়ে শহীদ হয়েছিল | এই ইতিহাসটা আমাকে মা বলেছে | কিন্তু আজ আমি ইতিহাস না, বর্তমানের কথা বলবো | ইতিহাস তো বই এর পাতায়, গুগুল সার্চ করলেই পাওয়া যায় | কিন্তু বর্তমানে বাংলা ভাষা আমাদের লাইফে কি , কতটা ইম্পরট্যান্ট সেটা আমি আমার বাড়িতে রোজ দেখি | আমার ঠাকুমা ইংলিশ জানে না | কারোর সঙ্গে দেখা হলে হ্যালো , হাও আর ইউ বলতে পারে না | কন্টিনেন্টাল ডিশ এর মানে বোঝে না | এমনকি আন্টি ডাকটাও ঠাকুমার কাছে অজানা, তার বদলে কাকিমা জেঠিমা শুনেই অভ্যস্ত | আর এই সবের জন্যই ছোট থেকে দেখছি আমাদের বাড়িতে আমার ঠাকুমাকে নিয়ে সবার খুব লজ্জা | বাবা নিজের ফ্রেন্ডস সার্কেলের সঙ্গে ঠাকুমার পরিচয় করিয়ে দেয় না কখনো , বাড়িতে কিটি পার্টি হলে মা ঠাকুমাকে স্ট্রিকটিলি বারণ করে দেয় যেন নিজের ঘর থেকে না বেরোয় , ড্রইং রুমে ভুল করেও সবার সামনে না আসে | এমনকি আমার বার্থডে পার্টিতেও ঠাকুমার এন্ট্রি আমার মা বাবা পছন্দ করে না | ঠাকুমাকে না কি ফাইভ ষ্টার হোটেলে নিয়ে যাওয়া যায় না | তার জন্য সাত দিন ধরে বাড়িতে ঝামেলা হয়, মা বাবার সঙ্গে কথা বন্ধ করে দেয় | ছোট থেকে আজ অব্দি দেখেছি মা বাবা ঠাকুমাকে যেন সবার থেকে লুকিয়ে রাখতে চায় | গড়গড় করে ইংলিশ বলতে পারে না বলে সে এথিকেটস জানে না, লোকের সাথে মিশতে জানে না , মুখ খুললেই ব্লান্ডার করবে এই রকমই একটা ধারণা সবার | যদিও আমার ঠাকুমা দারুন রান্না করতে পারে, ভীষণ সুন্দর গানের গলা এই বয়সেও , রবীন্দ্রসংগীত খুব সুন্দর গায় | দারুন ভালো গল্পও বলতে পারে | ছোটবেলায় তো মা বাবা অফিস থেকে অনেক রাত করে ফিরতো , তখন ঠাকুমাই আমাকে ঘুম পাড়াতো , রূপকথার গল্প শুনিয়ে | না , ফেয়ারিটেলের মানে না জানা থাকলেও ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী কি কথা বলে সেটা জানে ঠাকুমা | কিন্তু ওই যে বললাম , ফেয়ারিটেল এ যেই ক্লাস টা আছে, সেটা ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমিতে নেই হয়তো | তাই মা বাবা বলে ঠাকুমারও কোনো ক্লাস নেই | আজ একুশে ফেব্রুয়ারি তে তাই এই কথাটাই মনে হচ্ছে , মানে আমার বাড়ির বাকি ৩৬৫টা দিনের ছবি দেখে এই কনক্লিউশনেই এলাম, এখন বাংলা ভাষাটা বাতিল ভাষা | শুধু বাংলায় কথা বলাটা লজ্জার | সে আমরা এই ভাষা দিবসে যতই স্পিচ দিই না কেন, যতই ইতিহাস শোনাই না কেন , আমাদের মধ্যে বাংলা ভাষা এখন শেষ | আর আমি নিজের বাড়িতে রোজ সেই শেষটার একটা ছবি দেখি | ".,.... স্পিচটা শেষ করে স্টেজ থেকে নিচে নেমে খুব অদ্ভুত চোখে তাকিয়েছিলো তাতান ওর মা বাবার দিকে | সেই দৃষ্টিতে একটা জমা রাগ ছিল , একটা খারাপ লাগা ছিল | সেইদিন তাতানের স্পিচ শুনে কেউ হাততালি দেয়নি অডিটোরিয়ামে | সবাই কেমন নিঃস্তব্ধ ছিল | আসলে বাস্তবের মুখোমুখি হয়েছিল হয়তো সবাই , রোজকার বাংলা ভাষার বাস্তবের ! আর সেইদিন হাজার চেষ্টা করেও পার্থ আর মল্লিকা নিজের চোখ দুটোকে ওপরে তুলতে পারেনি | বার বার লজ্জায় সেটা নিচে নেমে যাচ্ছিলো | পার্থর ভেতরে একটা জমা কষ্ট হঠাৎ যেন এসে জমা হলো | সত্যি , যেটা ওর ছেলে বুঝলো এই বয়সে , সেটা পার্থ এতো সাকসেসফুল একটা মানুষ, এতো বড়ো একজন ডাক্তার হয়েও বুঝতে পারলো না ! মাঝে মাঝেই ভিড় রাস্তায়, ট্রাফিকের জ্যামে মা এর মুখটা ভেসে আসছিলো চোখের সামনে | সত্যি তো, মা কি সুন্দর গান গাইতো | কত সুন্দর সুর ছিল মা এর গলায় | এতদিন যেন ভুলেই গিয়েছিলো পার্থ সেই সুরটাকে | মা তো ওকেও ছোটবেলায় রূপকথার গল্প শোনাতো , রাজপুত্র , রাজকন্যা , রূপকথার দেশ | আর আজ পার্থ তো ওর মার্ সাথে দু মিনিট বসে কথা ও বলে না দরকার ছাড়া | কি করে , কবে ওর মা ওর কাছে লজ্জা হয়ে গেলো , ও বুঝতেই পারলো না ! কথাটা ভাবতে ভাবতেই ফ্ল্যাটের সামনে এসে গাড়িটাকে থামালো | লিফ্ট এ উঠে চার তলার বটনটা প্রেস করলো | একটা সময় স্কুল ছুটি হলে মা কে দেখার যেই একটা তাড়া থাকতো , আজও ঠিক সেই রকম একটা তাড়া আছে ওর | মা কে দেখতে , মা এর সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে আজ | ফ্ল্যাট এর দরজার সামনে এসে তাই জোড়ে জোড়ে কলিংবেলটা বাজালো | দু মিনিটের মধ্যে কাজের মাসি মিনতি দরজাটা খুলতেই পার্থ হুড়মুড়িয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো | কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মতন লাগছে ওকে | ড্রইং রুমের কোথাও মা কে দেখতে না পেয়ে মালতিকে প্রশ্নটা করে ফেললো ,---- " কি রে , মা কোথায় রে ? তাড়াতাড়ি বল |" ......... মালতি নির্বিকার ভাবে উত্তর দিলো , -- " কোথায় আবার, নিজের ঘরেই থাকবে ! "... পার্থ আর টাইম ওয়েস্ট না করে দৌড়ে মা এর ঘরে গিয়ে দরজাটা ধাক্কা মেরে খুললো | আর হঠাৎ পা টা থমকে গেলো | ঘরের মাটিতে মা পোড়ে আছে | নিথর একটা শরীর | তবে মুখে একটা শান্তি | জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার শান্তি | পার্থ সেদিন মা কে অনেক ডেকেছিল , অনেকবার মার্ শরীরটা ধরে ঝাঁকিয়েছিলো ,অনেক চেষ্টা করেছিল মায়ের সাথে কথা বলতে , কিন্তু সেদিন মা আর কোনো উত্তর দেয়নি | মা সারা জীবনের মতন চুপ করে গিয়েছিলো | পার্থ মা এর নিথর শরীরটা বুকে জড়িয়ে ধরে বসে ছিল অনেক্ষন | ওর যেন মনে হচ্ছিলো মা কে যদি এইভাবে আগলে রাখা যায়, ফিরিয়ে আনা যায় নিজের কাছে ! কিন্তু পার্থ বুঝতে পারেনি, সময় শেষ | কিছুক্ষন বাদে যখন মল্লিকা আর তাতান ঘরের নিঃস্তব্ধতা ভেঙে ভেতরে ঢুকলো , তখন ওর সম্ভিত ফিরলো | মায়ের ঠান্ডা শরীরটা ওকে বুঝিয়ে দিলো হঠাৎ, যে সব শেষ |
তিন ঘন্টা বাদে ডেথ সার্টিফিকেট লেখা ছিল স্ট্রোক এটার্কের জন্য মৃত্যু | পার্থর রিপোর্টটা চোখ বুলিয়ে যেন পা টা টাল খেয়ে গেলো | দু সপ্তাহ আগে তাতানের জন্মদিনের দিন রাত্রিবেলা মা ওর ঘরে এসেছিলো না ! প্রেসারের ওষুধের কথা বলতে ! আর ও মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলো | তারপর তো ও ওষুধের কথাটা ভুলেই গিয়েছিলো | আর বেশ কিছুদিন ধরেই তো মা এর হাই প্রেশারের প্রব্লেমটা চলছিল | তার জন্যই স্ট্রোক হলো না তো হঠাৎ ! ... তাহলে কি ওর জন্য ওর মা মারা গেলো !..
সেদিন চুল্লিতে মা কে ঢোকানোর সময় শেষবার মায়ের মুখটা দেখলো ও , আর কানে যেন একটা কথা বেজে উঠলো ,---"এন্ড আই ডোন্ট থিঙ্ক যে তুমি এতো সহজে পরলোকে যাবে |আমার লাইফটাকে হেল না করে তো তোমার যাওয়া হচ্ছে না |" .. ওর মা যখন সেইদিন ওষুধ কেনার কথা বলতে এসেছিলো ও তো মুখ ঝামটা দিয়ে এই উত্তরটাই দিয়েছিলো মা কে | আজ যেন চুল্লির আগুনে পুড়ে মা তার প্রত্যুত্তরটা দিয়ে গেলো | একটা অধ্যায় নিঃশব্দে শেষ হলো |

25/12/2025

Want your business to be the top-listed Government Service in KOLKATA?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Website

Address


কলিকাতা/কোলকাতা/Kolkata
Kolkata
700000