18/10/2026
ধর্ষণে অভিযুক্ত দুষ্মন্ত গৌতমকে সিকিমের রাজ্যপাল নিয়োগ বিজেপি কি ধর্ষকদের পৃষ্ঠপোষক?
পুরাণ কাহিনী অনুযায়ী রাজা দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার পুত্র রাজা ভরতের নামানুসারে আমাদের দেশের নাম হয়েছে ভারতবর্ষ। সেই ভারতবর্ষের বর্তমান শাসকদলের প্রাক্তন জাতীয় সচিব দুষ্মন্ত কুমার গৌতমকে মহাভারতের দুঃশাসন বললে ভুল হবে না। দুঃশাসন রাজসভায় পাশা তথা জুয়া খেলায় বাজি রাখা পাণ্ডব বধূ দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ করেছিল। আর আধুনিক যুগের রাজকুলের এক সদস্য দুষ্মন্ত গৌতম, দেবভূমি হিসেবে পরিচিত উত্তরাখণ্ডের হৃষিকেশ অঞ্চলের জনৈক রিসর্টে দশ হাজার টাকার বিনিময়ে রিসর্টের একজন রিসেপশনিস্ট যুবতীর সাথে আমোদ প্রমোদ করার অফার দিয়েছিলেন। আত্মমর্যাদা বোধ সম্পন্ন সেই যুবতী রাজকীয় পরিষেবায় অসম্মতি জানিয়ে প্রতিবাদ করায়, তার জীবনে নেমে এসেছিল বর্বর ও পাশবিক অত্যাচার। ঘটনার ছয় দিন পর পাশ্ববর্তী এক খাল থেকে মৃত যুবতীর ছিন্নভিন্ন দেহ উদ্ধার হয়েছিল। এতক্ষনে নিশ্চই আপনাদের স্মৃতিশক্তি সেই হতভাগা মেয়েটিকে চিনতে পেরেছে। হ্যাঁ, ভারতবর্ষের দেবভূমি উত্তরাখণ্ডের এক প্রত্যন্ত এলাকার নিম্ন বিত্ত ঘরের একমাত্র সন্তান ছিল অঙ্কিতা ভান্ডারী। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কোভিড অতিমারির এক বিপন্ন সময়ে সাধুর ছদ্মবেশে কয়েকজন দুঃশাসন ও আধুনিক যুগের রাজকুলের প্রতিনিধি দুষ্মন্ত সদ্য যুবতী অঙ্কিতাকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছিল।
সম্প্রতি, VVIP সংযোগের সূত্র ধরে অঙ্কিতার পরিবার ও প্রতিবাদী নাগরিক সমাজের চাপে উত্তরাখণ্ড সরকার CBI তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু এর পরপরই অভিযুক্ত রাজকীয় VVIP মিস্টার দুষ্মন্ত কুমার গৌতম সিকিমের রাজ্যপাল থুড়ি পদ্মপাল হিসেবে নিযুক্ত হয়ে যায়। "মাদার অফ ডেমোক্রেসি" হিসেবে পরিচিত আমাদের দেশ ভারতবর্ষের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী ধর্ষণ খুনের মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে দুষ্মন্ত কুমারের জেল Custody তে থাকার কথা ছিল। অথচ তিনি কিনা দেশের একটি রাজ্য শাসন করার সাংবিধানিক ও আইনি স্বীকৃতি পেয়ে গেলেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই বাবা মা সহ গোটা পরিবার ও আত্মীয়রা উষ্মা প্রকাশ করে সরকারের কাছে আবেদন করেন যে CBI তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত মহাশয়ের রাজ্যপাল পদে পদোন্নতি রদ করা হোক। কে শোনে কার কথা, বিশেষত শাসক যখন একটা স্বৈরাচারী দুষ্কৃতী রাজ তথা জঙ্গল রাজ কায়েম করতে চায় তখন ন্যায় বিচার আইন সংবিধান এসবের তোয়াক্কা করে না। ২৪ ঘন্টা পরে সরকারের কোনো জবাব না পেয়ে অঙ্কিতার বাবা মা আত্মীয়দের সাথে ইন্ডিয়া গেটে ধর্নায় বসেন। কংগ্রেস নেতা নেত্রী রাহুল প্রিয়াঙ্কা সহ আরও কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যোগ দেন। এর পরেই কুখ্যাত দিল্লি পুলিশ অঙ্কিতার মা ও বাবাকে অ্যারেস্ট করে। এবার আপনাদের নিশ্চই উত্তরপ্রদেশের হাথরাসের ঘটনা মনে পড়ছে। হ্যাঁ, এটাই হয়তো শাসক বিজেপির হিন্দু রাষ্ট্র। যেখানে ধর্ষক খুনি দুর্নীতিবাজ ডাকাতরা থাকবে সুরক্ষিত কিংবা বাইরে ঘুরবে Bail নিয়ে আর নিরপরাধ ও ন্যায় বিচার চাওয়া বাবা মা দিদি দাদা জনৈক প্রতিবাদকারী থাকবে জেলে, বছরের পর বছর Bail পর্যন্ত জুটবে না।
পাঠকদের সুবিধার জন্যে, অঙ্কিতা ভান্ডারীর হত্যাকাণ্ডের একটা সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন নিচে দেওয়া হলো। এটা দেখলে ও পড়লে আপনারা RGKAR এর অভয়া ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার সাথেও কিছু মিল খুঁজে পাবেন। বলতে পারেন সারা দেশ জুড়ে আজ ধর্ষণ ও খুনের একটাই মডেল চলছে। অর্থাৎ শাসক দলের নেতা মন্ত্রী VVIP, এরা নারীদের ওপর যৌণ অত্যাচার করবে ধর্ষণ করবে, বাধা দিলে খুন করে গুম করে দেবে। তারপর সত্য সামনে আসতে থাকলে পুলিশ প্রশাসন রাজকীয় VVIP দের আড়াল করবে। আর ঘটনা স্থল যদি কোনো হাসপাতালের সেমিনার রুম কিংবা কোনো রিসোর্ট বা হোটেল হয় তাহলে সেটা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেবে। ব্যাস সব প্রমাণ লোপাট। এবার ডবল ইঞ্জিন সরকারের তোতা CBI এসে সব কিছু ঝুলিয়ে দেবে। তারপর মূল অভিযুক্ত ভিভিআইপি'র পদোন্নতি হবে এবং তিনি তথাকথিত আইন বিচার এসবের ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবেন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের রং পৃথক হলেও এই ছকটা কিন্তু আমাদের সবারই বেশ চেনা চেনা। বিশেষত নিউ নরম্যাল ভারতের খুব চেনা চিত্র।
🔴অঙ্কিতা ভাণ্ডারী হত্যা মামলা: ঘটনাক্রম
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২: উত্তরাখণ্ডের ঋষিকেশের ভানান্তরা রিসর্ট থেকে ১৯ বছর বয়সি রিসেপশনিস্ট অঙ্কিতা ভাণ্ডারী নিখোঁজ হন।
২৩–২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২: রিসর্টের মালিক পুলকিত আর্য (তৎকালীন বিজেপি নেতা বিনোদ আর্যের ছেলে), ম্যানেজার সৌরভ ভাস্কর এবং সহকারী ম্যানেজার অঙ্কিত গুপ্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিন পর চিল্লা খালে অঙ্কিতার দেহ উদ্ধার হয়।
১৯ ডিসেম্বর, ২০২২: উত্তরাখণ্ড পুলিশ ৫০০ পাতার চার্জশিট দাখিল করে। চার্জশিটে বলা হয়, ভিআইপি গ্রাহকদের ‘বিশেষ পরিষেবা’ দিতে অস্বীকার করায় অঙ্কিতাকে হত্যা করা হয়েছিল।
১৮ মার্চ, ২০২৩: কোটদ্বার সেশনস কোর্ট পুলকিত আর্য, সৌরভ ভাস্কর ও অঙ্কিত গুপ্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে ফৌজদারি অভিযোগ গঠন করে।
১৯ মে, ২০২৫: ৪৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের পর কোটদ্বার আদালতে মামলার বিচারপর্বের শুনানি শেষ হয়।
২৯–৩০ মে, ২০২৫: আদালত তিন অভিযুক্তকেই দোষী সাব্যস্ত করে। পুলকিত আর্য, সৌরভ ভাস্কর ও অঙ্কিত গুপ্তকে সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি, প্রত্যেকের ওপর ৪ লক্ষ টাকা করে জরিমানা ধার্য করা হয়। জরিমানার অর্থ মৃতার পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
৪–৬ জানুয়ারি, ২০২৬: ‘ভিআইপি’ যোগের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দা এবং শাসকদল বিজেপির কয়েকজন সদস্য সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে সিবিআই তদন্তের দাবি জানান। ৬ জানুয়ারি মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি আরও তদন্তের ঘোষণা করেন।
৩০ জুন, ২০২৬: উত্তরাখণ্ড হাইকোর্ট তিন দণ্ডিতের অন্তর্বর্তীকালীন স্বস্তি, সাজা স্থগিত এবং জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়।