08/11/2022
https://drive.google.com/file/d/1gbqPB7bs_sHfC-HrKdwICb8l-k3sJFO8/view?usp=drivesdk
KNS, Krantikari Naojoyan Sabha, is a youth organization.
05/05/2022
আজ মার্কসের জন্মদিন
05/05/2022
কার্ল মার্কস আধুনিক যুগে চিন্তাশীলদের জগতে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তার করা মানুষ। তাঁর জীবদ্দশা থেকে আজ পর্যন্ত গোটা দুনিয়াজুড়ে তাঁর মতবাদ যত মানুষ অনুসরণ করে চলেছেন, সংখ্যার বিচারে কেউ আশেপাশে নেই। 'কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো' এখনো অবধি দুনিয়াজুড়ে সবচেয়ে বেশি পঠিত বই। রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় তিনিই। সবচেয়ে বিতর্কিতও তিনি। আজ মার্কসের জন্মদিন।
|| কার্ল মার্কস ||
ডারউইন যখন অরিজিন অফ স্পিসিস লিখলেন মার্কস খুঁটিয়ে পড়লেন, উৎফুল্ল হলেন, বস্তুবাদী দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করার বহু মালমশলা পেলেন সেখানে। শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতির পক্ষে তা কাজে লাগবে। একজন বুর্জোয়া তাত্ত্বিকের কাছ থেকে গ্রহণ করতে তিনি দ্বিধান্বিত হননি। 'ক্যাপিটাল' প্রকাশের পর তার একটা কপি পাঠিয়েছিলেন ডারউইনকে। কিন্তু ইতিহাস বলছে ডারউইন সেটা নেড়েও দেখেননি।
এখানেই পার্থক্য একজন বুর্জোয়া তাত্ত্বিকের সাথে একজন প্রলেতারীয় তাত্ত্বিকের। হ্যাঁ, তাত্ত্বিকেরও শ্রেণী হয়, তত্ত্বেরও শ্রেণী হয়। এমনকি বিজ্ঞান, যা চরিত্রে বিশ্বজনীন হওয়ার কথা তারও শ্রেণী হয়, কেননা বিজ্ঞানীরা শ্রেণী পক্ষপাতিত্বের দোষে দুষ্ট।
প্রত্যেক তাত্ত্বিক, চিন্তাবিদই তাঁর চিন্তার বিষয়টা দেখেন নিজের শ্রেণীগত অবস্থান থেকে। ডারউইন শ্রমিকশ্রেণী থেকে উঠে আসা মানুষ ছিলেন না, মার্কসও ছিলেন না। কিন্তু মার্কস পেরেছিলেন সবকিছুকেই উৎপাদক শ্রেণীর জায়গা থেকে দেখতে। পেরেছিলেন বললে কম বলা হবে, এভাবে দেখলেই যে এতদিনের না পাওয়া উত্তরগুলোর হিসেব মিলবে; বহু বিকৃত ব্যাখ্যা সহজতর হবে।
কোপার্নিকাসের আগে অবধি যতদিন জ্যোতির্বিদ্যা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে চর্চা করা হয়েছে ততদিন বহু প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক পাওয়া যায়নি। কোপার্নিকাস যখন পৃথিবীকে ছেড়ে গ্রহদের চলাচলকে সূর্যের সাপেক্ষে দেখার চেষ্টা করলেন তখনই সমস্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব হলে। মার্কসের ক্ষেত্রেও তাই। এতদিন সমাজ, আইন, নীতি, দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি সবকিছু দেখা হয়েছিল শোষকের জায়গা থেকে, যারা উৎপাদন করে না তাদের জায়গা থেকে; মার্কস কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এলেন শোষিতকে; যারা উৎপাদন করে; যা প্রাণের, সভ্যতার মূল উৎস।
কার্ল মার্কস আধুনিক যুগে চিন্তাশীলদের জগতে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তার করা মানুষ। তাঁর জীবদ্দশা থেকে আজ পর্যন্ত গোটা দুনিয়াজুড়ে তাঁর মতবাদ যত মানুষ অনুসরণ করে চলেছেন, সংখ্যার বিচারে কেউ আশেপাশে নেই। 'কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো' এখনো অবধি দুনিয়াজুড়ে সবচেয়ে বেশি পঠিত বই। রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় তিনিই। সবচেয়ে বিতর্কিতও তিনি। তাঁকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা সারাক্ষণ থাকে বিরোধীদের।
মার্কস নির্ভুল, মার্কস সফল ভবিষ্যৎদ্রষ্টা - এভাবে দেখার কিছু নেই। এমনকি একান্ত অনুগামীরাও 'সবকিছুরই উত্তর মার্কস দিয়ে গেছেন' বলে মনে করেন না। বরং মার্কসবাদকে কিছু ভবিষ্যৎবাণীর সমষ্টির বদলে একটা পদ্ধতিতন্ত্র হিসেবে দেখাটাই সঠিক। সেটাই করেছেন পরবর্তীকালের সফল মার্কসবাদীরা।
বহুক্ষেত্রেই মার্কসের অনুমান ভুল হয়েছে তাঁর জীবদ্দশাতেই; নিজের অবস্থান বদলেছেন বারবার। আয়ারল্যাণ্ডের আন্দোলন নিয়ে ধারণা ভুল, রাশিয়া সম্পর্কে অনুমান বেঠিক, ভারতচর্চা শোচনীয়ভাবে আংশিক। তাঁর বেশিরভাগ কাজই পশ্চিম ইউরোপকেন্দ্রিক; তাতে কী ই বা আসে যায়! তাঁর উদাহরণগুলো ইউরোসেন্ট্রিজমের দোষে দুষ্ট বটে, কিন্তু তার মানে তিনি ইউরোপের কীর্তিকলাপের সমর্থক - তা মোটেও নয়; বরং তার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। ২৭ বছর বয়স থেকে যতদিন বেঁচে ছিলেন লোকটার নিজের দেশ বলে কিছু ছিল না, কোনো দেশের নাগরিকত্ব ছিলনা। রাষ্ট্রহীন মানুষ, এক দেশের শাসকের তাড়া খেয়ে অন্য দেশে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে।
কোনো বিষয়েই তাঁর অনীহা ছিলনা। পড়েছেন বহু। বহু বিষয়ে উল্লেখযোগ্য মতামত ব্যক্ত করেছেন, মৌলিক অবদান রেখেছেন। কিন্তু মার্কসবাদ বলতে আমরা দর্শন, অর্থনীতি আর রাজনীতির বিষয়ে তাঁর মৌলিক অবদানকেই ধরব। জার্মানীর ধ্রুপদী দর্শন, ইংল্যান্ডের অর্থনীতির চর্চা ও শ্রমিক আন্দোলন এবং ফ্রান্সের রাজনৈতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক মতবাদ নিয়ে বিতর্কের পরিবেশ তাঁর নতুন মতবাদের ভিত্তিভূমি।
হেগেল এবং নব্য হেগেলপন্থী, বিশেষত ল্যুদভিগ ফয়েরবাদের হাত ধরে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শনের প্রতিষ্ঠা করা; আ্যডাম স্মিথ রবাট ওয়েনের অর্থনীতির তত্বের সমালোচক হিসেবে 'বিচ্ছিন্নতার তত্ত্ব', 'উদ্বৃত্ত মূল্য'র তত্ত্ব উদ্ভাবন করা; প্রুঁধো, বাকুনিনদের নৈরাজ্যবাদী তত্ত্বর সাথে ক্রমাগত পলেমিকের মাধ্যমে শ্রমিকশ্রেণী কর্তৃক বুর্জোয়াশ্রেণীর উচ্ছেদ এবং শ্রমিকরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রসারিত করা, উৎপাদকের মুক্তসংস্থা প্রতিষ্ঠা করার রাজনৈতিক তত্ত্ব প্রণয়ন তার মৌলিক কাজ।
পুঁজির দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনীতি বিষয়টাকে দেখলে মনে হবে পুঁজিপতিরাই শ্রমিকদের কাজ দেয়, তাকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখে, পুঁজিপতিদের দেওয়া ট্যাক্সেই দেশ চলে। আর শ্রমের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখতে পাবেন শ্রমিকরাই পুঁজিপতিদের খাওয়ায়। উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব থেকে দেখবেন পুঁজিপতিদের মুনাফাটা আসলে পুরোটাই শ্রমিকের শ্রম চুরি করে করা হয়। 'মজুরি শ্রম'-র আলোচনায় মার্কস দেখাচ্ছেন কীভাবে মালিকের কাছে একজন শ্রমিক তার শ্রমশক্তিকে আর বাকি পাঁচটা কাঁচামালের মত বিক্রী করে। ঐ শ্রমটাকে সে সম্মান করেনা, কারণ ঐ শ্রমের মধ্যে সে বেঁচে থাকেনা, সে বাঁচে বাকি সময়টা; আর বাকি সময়ের বেঁচে থাকার জন্য একজন শ্রমিক ঐ একঘেয়ে, বিরক্তিকর শ্রমপ্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকে। এখান থেকেই বুঝতে হবে শ্রমিকের 'বিচ্ছিন্নতার তত্ত্ব'। বুঝতে হবে শ্রমিক শ্রেণীর ভেতর থেকে চেতনার উন্মেষ হওয়ার সম্ভাবনার সূত্রটা কেননা একারণেই মার্কসের কাছে শ্রমিক শ্রেণী বিপ্লবী শ্রেণী। সেই ক্ষমতা দখল করতে পারে, বদলে দিতে পারে ব্যবস্থাটা।
ব্যবস্থা বদল মানে পুঁজিবাদের সাইনবোর্ড খুলে সমাজতন্ত্রের সাইনবোর্ড লাগানো নয়। ব্যবস্থা বদল মানে উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা কোনো ব্যক্তির অধীনে না রেখে তার সামাজিকীকরণ, শ্রমিকের সামাজিক উদ্যোগ বৃদ্ধি করা, মজুরী-শ্রমিক থেকে তাকে স্বাধীন উৎপাদকে রূপান্তর করা। মার্কসের পরবর্তীতে ফলিত সমাজতন্ত্রে এই জায়গাটাই যত্ন নিয়ে করা হয়নি। উৎপাদনের উপকরণের রাষ্ট্রীয় মালিকানা হয়েছে, সামাজিক মালিকানা হয়নি। শ্রমিকশ্রেণীর অবস্থা ডালভাত খাওয়া রোবট থেকে বিরিয়ানি খাওয়া রোবট হয়েছে বটে, কিন্তু সে স্বাধীন উৎপাদকে পরিণত হয়নি, শ্রমিকশ্রেণীর দোহাই দিয়ে বুদ্ধিজীবী, মধ্যবিত্তদের ক্ষমতা কায়েম হয়েছে। এটা মার্কসবাদ সম্মত নয়, এর তীব্র সমালোচনা মার্কসবাদীরাই করেছে। মার্কসবাদের বিরোধীরাও সমালোচনা করেছে, অবশ্য তারা করেছে শ্রমিকরা ডালভাতের বদলে বিরিয়ানী কেন খেতে পাচ্ছে তার জন্য গায়ের জ্বালায়। স্বাভাবিক। যাইহোক, মার্কসবাদ সম্মত নয় বলেই সমাজতন্ত্রের সাইনবোর্ডের আড়ালে ফিরে এসেছে পুঁজিবাদ।
এর মধ্যে দিয়ে কি মার্কসবাদ ব্যর্থ হয়ে গেল? ভ্রান্ত বলে প্রমাণ হল? দুদশক আগে খুব আলোচনা হয়েছিল - শ্রেণীযুদ্ধ নাকি শেষ, আর অন্য কোনো বিকল্প নেই। গোটা দুনিয়াজুড়ে শ্রমিকশ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সামনে হাজারটা প্রতিবন্ধকতা হাজির করে ভেবে নিয়েছিল ইতিহাসের বুঝি অবসান। কিন্তু কোথায় কী? আগের দুদশকের হতাশা কাটিয়ে এদশকে আবার লড়াই দানা বাঁধতে শুরু করেছে। পুঁজির সাথে শ্রমের, পুঁজির সাথে না-পুঁজির, কেন্দ্রের সাথে প্রান্তের। আর সেখানেই হাতিয়ার হয়ে উঠছে মার্কসের চিন্তা। বিশ্বব্যাপী মার্কসের বই পড়ার আগ্রহ বাড়ছে। সমীক্ষা বলছে আগ্রহ বাড়ছে কিশোরদের মধ্যে। শেষ তিন দশকেও যতবার বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে ততবারই 'ক্যাপিটাল'-র বিক্রী বেড়ে গিয়েছে, শাসকও তার রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার সমাধান খুঁজতে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর পাতা উল্টিয়েছে।
মার্কস পড়ুন।
লেখা - Arijit Chakraborty
ডিজাইন - Raja
06/01/2022
■ প্রেস বিজ্ঞপ্তি ■
মানুষ মারা ও পরিবেশ ধ্বংসকারী দেউচা পাঁচামি খোলামুখ কয়লা খনি প্রকল্প অবিলম্বে বাতিল করো----------------------
সম্প্রতি রাজ্যে বীরভূম জেলার দেউচা পাঁচামিতে খোলামুখ কয়লা খনি গড়ে তোলা নিয়ে রাজ্য রাজনীতি আবার সরগরম হয়ে উঠেছে।প্রায় তিন হাজার একর জমিতে কয়লা খনি প্রকল্প গড়ে উঠবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবী করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই আমরা জেনেছি প্রথমে আরও ৬টি রাজ্য যৌথভাবে এই কেন্দ্রীয় প্রকল্পে থাকলেও তারা সকলে হাত গুটিয়ে নিয়েছে। ইস্টার্ন কোল্ডফিল্ড সংস্থাও কয়লা উত্তোলনের দায়িত্বে আর থাকছেনা। সদ্য বিধানসভায় ২১৭ আসনে জয়লাভের পরে মমতা ব্যানার্জির সরকার এককভাবে ঐ প্রকল্পের দ্বায়িত্ব নিয়ে সারা দেশকে দেখিয়ে দিতে চায়,তারা কত বড় "শিল্পবান্ধব"এবং এই শিল্পায়নের জন্য হাজার হাজার মানুষকে তাদের জীবন জীবিকা থেকে উচ্ছেদ হতে হলেও রাজ্য সরকারের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারনে প্রকল্প এলাকা তথা রাজ্যের মানুষ নাকি দুহাত তুলে তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসবে । নবান্নের নির্দেশের সাথে সাথে জেলা প্রশাসনও নানা উপায়ে জমি নেওয়ার কাজে নেমে পড়েছে।তাদের বক্তব্য এই উৎকৃষ্ট মানের কয়লা উত্তোলনের ফলে পশ্চিমবঙ্গ আগামী ১০০ বছরের জন্য বিদ্যুতে শক্তিশালী হয়ে উঠবে।এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ পাবে,প্যাকেজের ফলে তাদের জীবন আরো উন্নত হয়ে উঠবে।বিগত দিনে সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সকলের উন্নয়ন করার জন্য সরকার নাকি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ! মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন দেউচা নাকি সিঙ্গুর হবে না.....
কিন্তু প্রচারের ঢাকঢোল সরলেই বাস্তবত আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রকল্পের সূচনাপর্বের থেকেই রাজ্যসরকারের তরফে প্রকল্প সংক্রান্ত ব্যাপারে কোন সচ্ছতা তথা নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। উক্ত অঞ্চলে কোন আইনে জমি অধিগ্রহণ হবে তা নির্দিষ্ট না করেই প্রকল্পের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে৷ বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে একটি নাগরিক কমিটি বানানো হলেও উক্ত প্রকল্পকে ঘিরে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ - বিক্ষোভকে শোনা বা বোঝার জন্য কোন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জন শুনানি আয়োজন করেনি সরকার৷ বনাধিকার আইন ২০০৬ কে তোয়াক্কা না করেই বনাঞ্চলের জমি অধিগ্রহণ এর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। কর্মসংস্থান তথা ক্ষতিপূরণ এর প্রশ্নটিও গণতান্ত্রিকভাবে ঠিক না করে সরকার তথা শাসক দলের উদ্যোগে একতরফা ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ সব মিলিয়ে যে অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেউচা প্রকল্পে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তা পূর্ববর্তী বাম আমলের সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের থেকে মৌলিক ভাবে আলাদা নয়। এই কারণে আমরা এমকেপির তরফে অবিলম্বে এই প্রকল্প বাতিলের দাবি রাখছি।
ইতিমধ্যেই আমরা দেখছি এলাকার মানুষের ক্ষোভ বিক্ষোভ যথারীতি মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে ।প্রকল্পের প্রতিবাদে গড়ে উঠেছে নানান উদ্যোগ।ফলে সরকারের "গণতান্ত্রিক" মুখোশ ক্রমশ খুলে পড়তে শুরু করেছে।শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করায় প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে রুজু হচ্ছে মিথ্যা মামলা। প্রকল্প বাতিলের দাবিতে প্রতিবাদ মিছিল করার অপরাধে মহিলাদের ওপর তৃনমূলী দূস্কৃতি ও পুলিশের যৌথ হামলা পর্যন্ত হয়েছে।প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক ব্যাক্তি ও সংগঠনের ওপর চলছে নজরদারি ও প্রকল্প অঞ্চলে প্রবেশ করতে না দেওয়ার নানান অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।বিগত "বাম" সরকারের ন্যায় এই সরকারও কতগুলো মিথ্যার ওপর ভর করে,গায়ের জোরে এলাকার মানুষের মতামতের তোয়াক্কা না করেই যেনতেনপ্রকারেন প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।প্রকল্প এলাকার ১১টি মৌজায় 32হাজার মানুষ এই প্রকল্পের ফলে স্বমূলে উচ্ছেদ হবেন।পরিবার পিছু ১জনের চাকরির প্রতিশ্রুতির মধ্যে দিয়ে মানুষকে বিভাজিত করার কৌশলেও কাজ হচ্ছেনা।সিঙ্গুর এর মতোই কিছু মানুষকে সরকারিভাবে হাজির করে "জমিদাতারা অনেকেই জমি দিয়ে দিচ্ছে" এমন এক মিথ্যা নির্লজ্জ প্রচার উপস্থিত করার চেষ্টা হচ্ছে। দলীয় কর্মী ও সরকারি আধিকারিকদের মাধ্যমে এলাকায় সন্ত্রাস ও ভয়ের বাতাবরণ তৈরী করার চেষ্টা চলছে।
এই প্রকল্প অঞ্চলের মানুষ মূলত: অল্প স্বল্প চাষ আবাদ ও পাথর ভাঙার কাজে যুক্ত থেকে জীবন অতিবাহিত করে।।যারা পাথর ভাঙার কাজে যুক্ত এমন পরিবারের চারজনের মোট আয় দৈনিক 1400-1600টাকা।যদি রাজ্য সরকারের কথা সত্যি ধরে নিই তবে এমন পরিবারের একজনকে চাকরি দেওয়ার মানে হোলো একজনের রোজগারের পরিবর্তে তিনজনের কাজ হারানো। কৃষিকাজে নিয়োজিত পরিবারের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।২-৩বিঘা জমিতে কোনোরকমে এক পরিবারের দুই-তিন ভাই দিন গুজরান করতে পারলেও জমি হারিয়ে বিনিময়ে একজনের কাজ হলেও বাকি পরিবারের মানুষের ভবিষ্যৎ কি হবে তা সহজেই অনুমেয়।এবিষয়ে সিঙ্গুর আন্দোলনের সময়ে যে প্রশ্ন সামনে এসেছিল তার কোনো মিমাংসা সূত্র না খুঁজেই বা সেখান থেকে শিক্ষা না নিয়েই তৃনমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জি বাঘের পিঠে চেপে বসতে চাইছেন। সর্বোপরি এই অঞ্চলস্থিত পুরু ব্যাসল্ট এর স্তর ভেদ করে কয়লা কি করে উত্তোলন করা হবে, সেই কয়লা আদৌ আর্থিকভাবে লাভজনক হবে কিনা; নাকি বাস্তবত ওই কয়লা নয়, বরং উক্ত ব্যাসল্ট কে কব্জা করার জন্যই দেশি বিদেশি বিনিয়োগ হবে দেউচাতে - এইসমস্ত প্রশ্ন নানা মহল থেকে উঠছে৷
আজকের তৃণমূল সরকারকে মনে রাখতে হবে বুদ্ধবাবুরাও সেইসময় ২৩৫ আসনে বলিয়ান হয়েই আস্ফালন দেখিয়েছিলেন।আর আজ বিধানসভায় বা লোকসভায় তাদের অবস্থা নিশ্চয়ই বলে বোঝাতে হবে না।বার বার দেশি-বিদেশি শিল্পপতিদের স্বার্থবাহী "শিল্পায়ন" ,"উন্নয়ন" এর খোয়াব দেখিয়ে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে উৎখাত করার,বে-ঘর করার,উচ্ছেদ করার এই "উন্নয়ন"-এর তীব্র বিরোধিতা করছে মজদুর ক্রান্তি পরিষদ।এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে ঘোলা জলে মাছ ধরতে CPM,CONG এবং BJP এখানকার দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষদের জন্য কুম্ভীরাশ্রু বর্ষন করবে।বাস্তবতা হলো এই দলগুলো দেশি বিদেশি বৃহৎ পুঁজির স্বার্থের উন্নয়নের পূর্ন সমর্থক।তাই এদের সম্বন্ধে আমাদের অবশ্যই সজাগ থাকতে হবে।
আমরা দেখছি রাজ্য সরকার সহ অন্যান্য বিভিন্ন মহল থেকে এই খোলামুখ কয়লা খনি প্রকল্পের সমর্থনে দেশ তথা রাজ্যের উন্নয়নের যুক্তি, শক্তি উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা - ইত্যাদি হাজির করা হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশ সহ সারা বিশ্বে খোলামুখ কয়লাখনি নিয়ে বহু সমীক্ষা হয়েছে এবং সেই সমীক্ষাগুলোয় এটা প্রমাণিত যে খোলামুখ কয়লা খনি মানুষের জীবনে কি ভয়ংকর বিপর্যয় নামিয়ে এনেছে। একে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকা মানুষরা বেঁচে থাকে ধোঁয়া ধুলো ধুসরিত বাতাস বুকে নিয়ে আর দূষিত জল পান করে।মালিকী উন্নয়নের মডেলে বিপুল শক্তি উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা প্রধানত বৃহৎ সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের উদ্দ্যেশে তৈরি হচ্ছে না, বরং এই "অতি উৎপাদন" হচ্ছে পুঁজিবাদী মুনাফার উদ্দেশ্য নিয়ে। আমাদের দেশে তথা রাজ্যে শক্তি নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্য প্রকৃতি পরিবেশ ধ্বংসের আরো যৌক্তিকতা তৈরি করা হচ্ছে৷ আর অন্যদিকে এই বিপুল শক্তি উৎপাদন করার জন্য বিশ্বজুড়ে যে বিবিধ ধরণের পরিবেশ সংকট তৈরি হচ্ছে তার ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে সমগ্র রাজ্য - দেশ তথা বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষদের। শক্তি উৎপাদন তথা ব্যবহারের মধ্যে থাকা এই শ্রেনী বৈষম্যের দিকটিকে আড়াল করে সার্বিক উন্নয়নের প্রয়োজনে কয়লাখনি স্থাপনের যে যৌক্তিকতা হাজির করা হচ্ছে MKP তীব্রভাবে তার বিরোধিতা করছে। দেউচা পাঁচামি খোলামুখ কয়লাখনি প্রকল্প এর মধ্যে দিয়ে দেশি বিদেশি পুঁজিপতিদের উন্নয়নের নামে হাজার হাজার মানুষেকে উচ্ছেদ করা ও মানুষের বসবাস যোগ্য প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করার যে অপকর্ম আগামী দিনে হতে চলেছে অবিলম্বে তা বাতিল করার দাবি জানাচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধে সমস্ত সংগ্রামী প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক মানুষকে নিয়ে এক দুর্বার গণ আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান রাখছে।
আমাদের দাবি
ক) অবিলম্বে দেউচা পাঁচামি প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করতে হবে।
খ) সমস্ত আন্দোলনকারীদের উপর থেকে মিথ্যে মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
গ) 'উন্নয়নের' নামে পরিবেশ ধ্বংসকারী জল জঙ্গল জমি লুঠের সপক্ষে সরকারি প্রচার বন্ধ করতে হবে৷
কোলকাতা সংগ্রামী অভিনন্দন সহ
06/ 01/ 2022
কেন্দ্রীয় কমিটি
মজদুর ক্রান্তি পরিষদ (MKP)
14/06/2021
|| চে ||
“...তিনি মৃত তবু জীবিতের চেয়ে/ অনেক সজীব এবং কান্তিমান/ ভবিষ্যতের জন্য হেলায়/ দিয়েছেন ছুড়ে আপন বর্তমান।/ বুলেট বিদ্ধ মোহন গেরিলা/ প্রসারিত আজ নিখিল ভূমণ্ডলে।/ লেখার টেবিলে, কপাটে, দেয়ালে/ চে গুয়েভারার সুবিশাল চোখ জ্বলে।” - শামসুর রাহমান, চে গুয়েভারার চোখ।
বিপ্লব কখনো বিপ্লবীর মৃত্যুর সাথে শেষ হয়ে যায় না। তাই আজকের ও আগামীর বিপ্লবীদের মাঝে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে খ্যাতিমান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীদের অন্যতম চে, চে গেভারা। দুনিয়াব্যাপী ‘চে’ নামে পরিচিত হলেও তাঁর প্রকৃত নাম আর্নেস্তো গেভারা দে লা সেরনা। স্প্যানিশ ভাষায় ‘চে’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘প্রিয়’; কিউবায় সফল বিপ্লবের পর তাঁর কিউবান কমরেডরা তাঁর নাম দেন ‘চে’। তিনি এই নামটিকে এত বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন যে ১৯৬০ থেকে ১৯৬৭ সাল, অর্থাৎ তার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি তাঁর স্বাক্ষর হিসেবে ব্যবহার করতেন শুধুই এই শব্দটি- ‘চে’।
১৯২৮ সালের ১৪ই জুন আর্জেন্তিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সের উত্তর পূর্বে রোসারিও গ্রামে চে জন্মগ্রহণ করেন; পিতা আর্নেস্তো গেভারা লিনচ ও মাতা সিলিয়া দে সেরনা। আইরিশ পিতা ও স্প্যানিশ মাতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে চে’ই ছিলেন সবার বড়। শৈশব থেকেই একটি সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার পরিবারে বেড়ে উঠবার কারণে রাজনীতি সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান লাভ করেন চে। সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা চে’র পরিবারে ছিল তিন হাজারেরও বেশি বই যা চে’কে করে তোলে সমাজসচেতন। কার্ল মার্কস, ভ্লাদিমির লেলিন, উইলিয়াম ফকনার, এমিলিও সরগারির বইয়ের পাশাপাশি জওহরলাল নেহরু, আলবার্ট ক্যামাস, রবার্ট ফ্রস্টের বই পড়েছেন তিনি। এবং এভাবেই নিজেকে একজন সমাজসচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।
মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি হাঁপানি রোগে আক্রান্ত হন কিন্তু খুব ছোটবেলাতেই এই রোগের সাথে যুঝতে গিয়ে তাঁর মধ্যে প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর মানসিক দৃঢ়তা বিকাশ লাভ করে। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি খেলাধূলাতেও পারদর্শীও ছিলেন। সাঁতার, গলফ, ফুটবল, শুটিং, সাইক্লিং, রাগবি, ঘোড়সওয়ারি যাই হোক না কেন; কিছুই বোধহয় বাদ দিতে চাননি চে, হয়তো জীবনের কোন স্বাদই! ১১ বছর বয়সে পিতার কাছে দাবা খেলা শেখার পর থেকে প্রায়ই বুদ্ধি শানিয়ে নিতেন দাবার ছকে।
১৯৪৬ সালে আর্নেস্তো বুয়েন্স আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তি হন। প্রথম দিকে তিনি একজন প্রখ্যাত গবেষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু তাঁর ভ্রমণপিপাসু মনে সমগ্র লাতিন আমেরিকা ভ্রমণের ঝোঁক চাপে। ১৯৫১ সালে ২৩ বছর বয়সী আর্নেস্তো ২৯ বছর বয়সী বন্ধু আলবার্তো গ্রানাডোর সাথে লাতিন আমেরিকা ভ্রমণে বের হন। চে’র ‘মোটরসাইকেল ডায়েরীস’ থেকে পাওয়া যায় এই অভিযানটির কথা যার উদ্দেশ্য ছিল মূলত পেরুর সান পেবলোর লেপার কলোনিতে (কুষ্ঠ রোগীদের জন্য বিশেষ কলোনি) স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কয়েক সপ্তাহ কাজ করা।
এই ভ্রমণ তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল। এর মাধ্যমে তাঁর চোখে ধরা পড়ে শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ কষ্ট, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সার্বিক অসহায়ত্ব। তিনি দেখতে পান তাঁর চেনা জগতের সাথে সমান্তরালে বয়ে চলা এক অচেনা জগত যা শোষিত মানুষের জগত। এই ভ্রমণ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চে বুঝতে পারেন যে, ঐ অঞ্চলের বদ্ধমূল অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণ হল একচেটিয়া পুঁজিবাদ, নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ। তিনি অনুভব করেন, পরিবর্তন অনিবার্য; আর এই পরিবর্তনের জন্য আরো বেশি অনিবার্য একটি সশস্ত্র বিপ্লব। তিনি বিশ্বাস করতেন বিপ্লব কেউ কাউকে প্রদান করে না, বিপ্লব ছিনিয়ে আনতে হয়, বিপ্লব ঘটাতে হয়। কেউ কাউকে শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে দেয় না, মুক্ত নিজেদেরকেই হতে হয়।
চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক হওয়ার পর ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে চে তাঁর দ্বিতীয় লাতিন আমেরিকা ভ্রমণ শুরু করেন। বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, পানামা, কোস্টারিকা ও হন্ডুরাস হয়ে চে গুয়েতমালায় যান। সেখানে পেরুর রাজনৈতিক কর্মী হিলদা গাদিয়ার সাথে আর্নেস্তোর পরিচয় হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে হিলদা ও চে বিবাহ করেন। এই গুয়েতমালায় রাষ্ট্রপতি জ্যাকোবো অরবেঞ্জ গুজমানের নেতৃত্বাধীন সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে চে জড়িয়ে পড়েন ১৯৫৪ সালে। কিন্তু হণ্ডুরাস থেকে সিআইএ-এর সমর্থন পুষ্ট হানাদার বাহিনী গুয়েতমালায় আক্রমন করে। প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়ে অরবেঞ্জ পদত্যাগ করলে চে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং তাঁর বৈপ্লবিক আদর্শ চেতনা দৃঢ়তর হয়।
১৯৫৫ সালে মেক্সিকোতে গিয়ে ফিদেল ও রাউল কাস্ত্রোর সাথে চে’র পরিচয় হয়। ফিদেল চে’কে তাঁর গেরিলা বাহিনীতে গ্রহণ করেন এবং চে তাঁদের ‘ছাব্বিশে জুলাই’ আন্দোলনে যোগ দেন। মার্কিন মদতপুষ্ট কিউবান একনায়ক ফুলজেনসিও বাতিস্তাকে উৎখাত করার জন্য সমুদ্রপথে তাঁরা কিউবায় প্রবেশ করেন। কাস্ত্রো গেরিলা যুদ্ধের জন্য সিয়েরা মায়েস্ত্রোর পার্বত্য অঞ্চলকে বেছে নেন। বিশাল সবুজ বনাঞ্চলে ঢাকা ৬,০০০ ফুট উঁচু এই পার্বত্য অঞ্চলটিতে ১৯৫৬-এ শুরু হয় গেরিলাদের সংগ্রামী প্রশিক্ষণ।
খুব অল্পদিনেই চে বিপ্লবীদলের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। সেকেন্ড-ইন-কম্যাণ্ড পদে তাঁর পদোন্নতি হয় এবং বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে দুই বছর ধরে চলা গেরিলা সংগ্রামে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিউবান বিপ্লবে চে ডাক্তার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবে ডাক্তাররা কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে সে বিষয়ে চে একটি বই লেখেন। দুবছর পর ১৯৫৮ সালে সফল হয় কিউবান বিপ্লব। কিন্তু বিপ্লবীদের কাছে প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ ছিল নতুন সরকার গঠন করা ও দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পরাজিত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে জনগণের মনে যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা গড়ে উঠেছিল তা মেটানোর দায়িত্বও ছিল বিপ্লবীদের উপর।
বিপ্লব পরবর্তী এই সময়টিতে চে নতুন সরকারে একাধিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিপ্লবী আদালতে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্তদের আপিল পুনর্বিবেচনা ও ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড প্রদান, শিল্পোদ্যোগ মন্ত্রী হিসেবে খামার সংস্কার আইন প্রবর্তন, কিউবার জাতীয় ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর ইনস্ট্রাকশনাল ডিরেক্টরের ভূমিকা পালন, এবং কিউবান সমাজতন্ত্রের প্রচারে বিশ্বপর্যটন করেন চে। এই পদাধিকারবলে তিনি মিলিশিয়া বাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদানের সুযোগ পান। এর ফলে এই বাহিনী পিগ উপসাগর আক্রমণ করে তা পুনর্দখলে সক্ষম হয়। কিউবায় সোভিয়েত পরমাণু ব্যালিস্টিক মিসাইল আনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
কিউবার মহান বিপ্লবকে চে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ১৯৬৫ সালের ১লা এপ্রিল চে তাঁর কঙ্গো অভিযানের জন্য ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েন। আর ফিদেলের জন্য রেখে যান তাঁর সেই ঐতিহাসিক চিঠি। আবেগ ভারাক্রান্ত সেই চিঠিতে চে লিখেছেন, “আমি পার্টি নেতৃত্ব থেকে পদত্যাগ করছি। আমার মন্ত্রীর পদ, কম্যাণ্ডারের পদবী এবং কিউবার নাগরিকত্ব ত্যাগ করছি। কিউবার সঙ্গে আমার কোন আইনি সম্পর্কই থাকলো না, টিকে রইল শুধু সেই বন্ধন যা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করা যায় না।” চে আরো লিখলেন, “অন্য কোনো ভূমি, অন্য কোনো দেশ আমাকে আহ্বান করছে যথাসাধ্য কাজের জন্য। সে আহ্বানে আমি সাড়া দিতে পারি, কিউবার অগ্রনায়কের দায়িত্ব পালনের কারণে তুমি তা পারো না। তাই আমাদের বিচ্ছেদের সময় ঘনিয়ে এসেছে।”
চে কঙ্গোতে ছিলেন মাত্র ছ’মাস। কঙ্গোর স্থানীয় কমিউনিস্ট পর্টি সহযোগিতা না করায় এবং স্থানীয় ভাষা ও মানুষের চরিত্র বুঝে উঠতে না পারায় চে’র কঙ্গো অভিযান পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। তিনি অভিযানের ব্যর্থতা স্বীকার করে গেরিলা বহিনীকে দেশে ফেরত পাঠান। আর প্রাগ হয়ে হাভানায় ফিরে আসার পথে ডায়েরীতে লেখেন, “যে জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামে মনোবৃত্তি নেই আমরা তাদের মুক্ত করতে পারি না।” চে সত্যিকার মার্ক্সবাদীদের মত আত্মবিশ্লেষণ করতেন। নিজের ভুলগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে লিখে রাখতেন। কঙ্গোর ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষণ করে তিনি বই লিখেছিলেন যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘পর্সাজাস ডি লা গুয়েরা রেভ্যুলুসানিয়া কঙ্গো’, প্রথম পাতায় লিখেছেন ‘ব্যর্থতার ইতিহাস’।
চে’র পরবর্তী গন্তব্য ছিল বলিভিয়া। বলিভিয়া ছিল লাতিন আমেরিকার কেন্দ্রে, তাছাড়া তখন পর্যন্ত গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বলিভিয়ার মাটিই ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত। তাই বিপ্লব পরিচালনার জন্য বলিভিয়াকে বেছে নেয়া হয়। সেখানে বসে চে স্বপ্ন দেখতেন একদিন বলিভিয়ার বিপ্লব দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়বে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে। বিপ্লবের সেই আগুনে পুড়ে ছারখার হবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। বলিভিয়া হবে আরেকটি ভিয়েতনাম। কিন্তু তাঁর এই স্বপ্ন সত্যি হয়নি। দুঃখজনক ভাবে বলিভিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি মোঞ্জের বিশ্বাসঘাতকতা, বলিভিয়া সেনাবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ, স্থানীয় কৃষকদের অসহযোগিতা, রসদ ও ওষুধপত্রের অপ্রতুলতা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে চে’র বলিভিয়ার বিপ্লব ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ ১১ মাস সংগ্রামের পর ১৯৬৭ সালের অক্টোবরে চে ধরা পড়েন। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় লা হিগুয়েরাতে।
বলিভিয়ান হাইকম্যাণ্ড থেকে চে’কে হত্যার নির্দেশ আসে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে চে গেভারা সৈনিকদের বলেছিলেন, "আমাকে গুলি কোরো না। আমি চে গেভারা, আমাকে মেরে ফেলার পরিবর্তে বাঁচিয়ে রাখলে তোমাদের বেশি লাভ হবে।" কিন্তু তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি। ১৯৬৭ সালের ৯ই অক্টোবর সারারাত বলিভিয়ার লা হিগুয়েরা গ্রামের একটি স্কুলঘরে আটকে রেখে তাঁকে হত্যা করা হয়। বলিভিয়ার সার্জেন্ট মারিও টেরান মদ্যপ অবস্থায় চে’র কোমরের নীচে তাক করে গুলি করে। গুলি করার পর চে আরো ঘন্টাখানেক বেঁচে ছিলেন। পরিকল্পিতভাবে চে’কে যন্ত্রণা দেওয়ার জন্যই ওঁর মাথায় বা বুকে গুলি না করে কোমরে গুলি করা হয়েছিল। পরে বুকের বাঁদিকে গুলি করে এই মহান বিপ্লবীকে হত্যা করা হয়।
চে’কে ধরা ও হত্যা করার পেছনে কাজ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। মৃত্যুর পর তিনি বিশ্বজুড়ে বিপ্লবীদের কাছে নায়ক হয়ে ওঠেন। তাঁকে হত্যার পেছনে লাতিন আমেরিকার একনায়ক শাসক আলফ্রেদো ট্রয়েসনারের হাত ছিল বলে তথ্য দিয়েছেন প্যারাগুয়ের গবেষক মার্টিন আলমাদা। কারণ চে তাঁর বিরুদ্ধেও গেরিলা যুদ্ধ শুরু করতে পারেন বলে তাঁর ভয় ছিল। আসলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চরিত্রটাই এমন। তারা পৃথিবী জুড়ে মানবাধিকার ও শান্তির বার্তা প্রচার করে আর খনিজ তেল ও অস্ত্র বিক্রির স্বার্থে দেশে দেশে যুদ্ধ ও গণহত্যা চালিয়ে যায়।
বিপ্লবী চে, ডাক্তার চে’র পাশাপাশি চে একজন লেখকও ছিলেন। তিনি কিউবান ভাষায় প্রায় ৭০টি নিবন্ধ লেখেন। গেরিলা যুদ্ধের ওপর তিনি একটি ম্যানুয়েল রচনা করেন। লিখেছেন পাঁচটি বইয়ের ভূমিকা। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত ভাষণ আর সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রায় ২৫০-এর কাছাকাছি। বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে লেখা তার অসংখ্য চিঠির মধ্যে ৭০টির মত সংগৃহীত আছে। তাছাড়া প্রতিদিনের ঘটনাবলী লিখে রাখার অভ্যাস ছিল তাঁর। গেরিলা যুদ্ধকালীন যখন সবাই বিশ্রাম নিত তখন অন্যদের অবাক করে দিয়ে চে তার নোটবই বের করে ডাক্তারদের হস্তাক্ষরের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রায় অস্পষ্ট অক্ষরে লিখে চলতেন ডায়েরী। এই ডায়েরীটি তার বলিভিয়ার ডায়েরী বলে খ্যাত। এই ডায়েরীতে গেরিলা প্রধান হিসেবে তার দৃঢ়চরিত্রের বারংবার প্রমাণ মেলে।
চে’র মৃত্যুর পর নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, “একজন মানুষের সঙ্গে সঙ্গে একটি রূপকথাও চিরতরে বিশ্রামে চলে গেল।” টাইমস পত্রিকা বিংশ শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির যে তালিকা করেছে সেখানেও তাঁর নাম রয়েছে।
“চে তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়/ আমার ঠোঁট শুকনো হয়ে আসে, বুকের ভেতরটা ফাঁকা/ আত্মায় অবিশ্রান্ত বৃষ্টিপতনের শব্দ/ শৈশব থেকে বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাস.../ বলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা/ তোমার ছিন্নভিন্ন শরীর/ তোমার খোলা বুকের মধ্যখান দিয়ে/ নেমে গেছে/ শুকনো রক্তের রেখা...।” - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
লেখা - শোভন
ডিজাইন - Ramesh
09/06/2021
|| বিরসা মুণ্ডা ||
উনিশ শতকে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম কৃষক বিদ্রোহ, যে বিদ্রোহ দেশীয় জমিদার, জোতদারদের সাথে ইংরেজ শাসকের কপালেও চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল, সেই 'মুণ্ডা বিদ্রোহ'-এর অন্যতম নেতা বিরসা মুণ্ডার আজ শহীদ দিবস। ১৮৯৯-১৯০০ সময়কালে তিনি রাঁচির দক্ষিণাঞ্চলে এই বিদ্রোহ পরিচালনা করেন। অনেক ঐতিহাসিক এই বিদ্রোহকে 'উপজাতীয় বিদ্রোহ'-এর শ্রেণীভুক্ত করেছেন। এটা ঠিক, একটি নির্দিষ্ট উপজাতির মানুষের দ্বারাই এই বিদ্রোহ সংগঠিত ও সংঘটিত হয়। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হল এই 'উলগুলান' অর্থাৎ 'প্রবল বিক্ষোভ'-এর লক্ষ্য ছিল জায়গীরদার ও ঠিকাদারদের হাতে ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া জল-জঙ্গল-জমিনকে রক্ষা করা। শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে নিপীড়িত কৃষকশ্রেণীর এই অসম সংগ্রামকে তাই কেবল 'উপজাতি বিদ্রোহ' বলে দাগিয়ে দেওয়া যেন 'উলগুলান'-এর গৌরবময় গাথাকে লঘু করে দেখার সামিল।
ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার অনেক আগে থেকেই মুণ্ডা সহ অন্যান্য আদিবাসীদের কাছ থেকে জঙ্গল-জমি কেড়ে নেওয়ার খেলা শুরু হয়ে যায়। ব্রিটিশরাজ প্রতিষ্ঠা হওয়ার সুবাদে বিদেশী কোম্পানিগুলোর পক্ষে লুঠ করার যেন এক ছাড়পত্র পেয়ে যায়। বর্তমানেও দেশী ও বিদেশী উভয় কোম্পানীর দ্বারা সেই লুঠ চলমান। সেই সময় গোটা অঞ্চল যেন বিবেকহীন ঠিকাদারদের কাছে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক সংগ্রহের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। অন্যদিকে চলে ভুখা আদিবাসীদের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে শিক্ষা দেওয়ার নামে মিশনারিগুলোর ধর্মান্তরিত করার কাজ। নিজেদের বনভূমিতে যে তারাই পরাধীন, হাজার হাজার বছরের ধর্ম সংস্কৃতি থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করার যে বিশাল ষড়যন্ত্র চলছে; এ কথা খুব ছোট বয়সেই উপলব্ধি করেছিলেন বিরসা।
ছোটবেলায় লেখাপড়ার টানে কিছুদিন গ্রামীণ স্কুলে যাওয়া শুরু করলেও পরবর্তীতে এক মিশনারি স্কুলে ভর্তি হন। স্কুলে শর্ত দিয়েছিল, বিরসা এবং তার পুরো পরিবারকে খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হতে হবে। ধর্মান্তরিত হলেও নিজের ধর্মের প্রতি যে তাঁর শ্রদ্ধা রয়েই গেছিল তা বোঝা যায় যখন মিশনারি স্কুলের এক শিক্ষক মুণ্ডাদের নিয়ে একনাগাড়ে যা ইচ্ছে তাই বলে যান। সেদিন বিরসা মুখে কিছু বলতে না পারলেও প্রতিবাদে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যান। ওই অল্প বয়স থেকেই আদিবাসীদের উপর হওয়া অন্যায়, অবিচার অস্থির করে তুলছিল বীরসাকে।
১৮৯৩-৯৪ সালে তিনি বনবিভাগ কর্তৃক গ্রামের পতিত জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে তিনি মুণ্ডাদের কাছে হয়ে ওঠেন 'ধরতি আবা' বা 'জগৎ পিতা'। মুণ্ডাদের মুখে বিরসার জয়ধ্বনি শুনে ব্রিটিশরা আগেভাগেই বিদ্রোহের আঁচ অনুভব করতে পারছিল। তাঁর নেতৃত্বেই আদিবাসীদের মধ্যে বন আর ভূমি নিয়ে অধিকারবোধ দানা বাঁধে। অন্যদিকে এই বিদ্রোহকে দমন করার জন্য ও বিরসাসহ বাকী বিপ্লবীদের জব্দ করার জন্য ষড়যন্ত্র করে ব্রিটিশ সরকার পুরোনো বন আইনকে ছোটনাগপুর জঙ্গলে প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই খবর মুণ্ডাদের মধ্যে ছড়িয়ে যেতেই তারা বীরসার নেতৃত্বে ফুঁসে ওঠে, পাহাড় জঙ্গলের মুণ্ডাসহ অন্যান্য আদিবাসী কৃষকরা গর্জে ওঠে; বিদ্রোহের ডাক দেয়। ঠিক এই সময়টার জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল ব্রিটিশ সরকার। উসকানি আর বিদ্রোহে মদত দেওেয়ার অভিযোগে বিরসাকে আটক করে ব্রিটিশ সরকার। দীর্ঘ দুবছর তারা তাঁকে আটকে রাখে, তারপরেও থিতিয়ে পড়েনি তাদের বিদ্রোহ। জেল থেকে বেরিয়ে আবার তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন 'উলগুলান' বা 'স্বাধীনতা যুদ্ধে'। ব্রিটিশ সরকারের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সামনে বিরসাদের তীর ধনুক পরাজিত হয়। বিরসাসহ শতাধিক সঙ্গী গ্রেপ্তার হন। বিচারে তাঁদের ফাঁসির হুকুম হয়। ১৯০০ সালের ৯ই জুন রাঁচির কারাগারে বন্দীদশায় বিরসার মৃত্যু হয়। ধৃতদের মধ্যে অন্যান্য দুজনের ফাঁসি হয় এবং বাকীদের হয় দ্বীপান্তর।
ঝাড়খণ্ডের উলিহাটু গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন বিরসা। দরিদ্র বর্গিচাষির ছেলে বিরসা। দারিদ্র্য ছিল যার চিরসঙ্গী। আর পাঁচজন আদিবাসী ছেলেদের মতই ছিল তাঁর ছেলেবেলা। তিনি ভালোবাসতেন বাঁশি বাজাতে, কিন্তু বেঁচে থাকার অধিকারের লড়াই তাঁকে হাতে তুলে নিতে বাধ্য করেছিল তীরধনুক। সেদিন যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু আদিবাসীদের মনে জল-জঙ্গল-জমির যে অধিকারবোধ জাগিয়ে দিয়েছিলেন তা আজও অটুট। তাই আজও তাদের লড়াই জারি থাকে তাদের জমি কেড়ে নেওয়া রুখতে, তাদের জঙ্গল বেচে দেওয়া রুখতে।
লেখা - Tamali Roy
ডিজাইন - Rajdeep Singha Roy
22/05/2021
|| কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ||
কমিউনিস্টদের কোনো জাতিরাষ্ট্র হয় না, সেই হিসেবে কমিউনিস্টরা চরিত্রে আন্তর্জাতিক। সেজন্যেই কোনো ভৌগোলিক ক্ষেত্রে কমিউনিস্টরা তাদের সমাজ ভাবনার মত করে অনুশীলন শুরু করলে সেটা সেই জায়গায় থাকা সংখ্যাগুরু জাতির জাতিরাষ্ট্র না হয়ে শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্র হয়ে ওঠার কথা। সোভিয়েত রাশিয়ার শুরুটা অন্তত সেভাবেই হয়েছিল। সে হিসেবে একটি উপনিবেশের মানুষ হিসেবে, মেহনতি মানুষের অংশ হিসেবে আমাদেরও হক ছিল সেই দেশটায়, ছিল রক্ষা করারও দায়।
শ্রমিকশ্রেণীর বিভিন্ন রকমের নিজস্ব দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অগ্রণী হল কমিউনিস্ট পার্টি। আগেই বলেছি, নিজগুণেই সে আন্তর্জাতিক চরিত্রের, কিন্তু আজকের বাস্তবতায় তাকে কাজ করতে হয় আলাদা আলদা জাতিরাষ্ট্রের সীমার মধ্যেই। সেই কারণেই সমান্তরালভাবে শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠনের দরকার-- এটা অনুভব করেছেন হরেক কিসিমের বামপন্থী চিন্তাবিদরা।
আক্ষরিক অর্থে 'কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক' বলতে আমরা বুঝি ১৯১৯-তে প্রতিষ্ঠিত তৃতীয় আন্তর্জাতিককে। যার অন্য আর একটা নাম কমিন্টার্ন। তৃতীয় মানেই প্রথম, দ্বিতীয় থাকতেই হবে। এমনকি একটা আড়াইও ছিল। সাড়ে তিন, চার, পাঁচ। তাদের কারোরই নাম কিন্তু কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ছিল না। বিভিন্ন কিছু ছিল। আমরা তাদের সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যে অতি সংক্ষেপে আলোচনা করব।
১) প্রথম আন্তর্জাতিকঃ-
এটার সাবেকী নাম ছিল ইন্ট্যারন্যাশানাল ওয়ার্কিংমেন'স অ্যাসোসিয়েশন, IWMA। ১৮৬৪ সালে এটা তৈরি হয়েছিল। আত্মপ্রকাশ করেছিল, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, লণ্ডনের সেন্ট মার্টিন'স হলে। এটাতে যেমন মার্ক্স এঙ্গেলসের মত কমিউনিসমের প্রবক্তারা ছিলেন, তেমনই ছিলেন অর্থনীতিবাদী রবার্ট ওয়েনের অনুগামীরা; ছিলেন স্বয়ং বাকুনিন কিংবা প্রুঁধোর মতো নৈরাষ্ট্র্যবাদীর অনুগামীরা, অনুগামী সহ বামপন্থী সোশ্যালিস্ট স্বয়ং ব্ল্যাঙ্কি। হিসেব বলছে, প্রায় ৮০ লক্ষ সদস্য ছিল এই সংগঠনটার। শুরুতে সদস্য হিসেবে কেবল পুরুষ শ্রমিকরা থাকলেও প্রতিষ্ঠার পরের বছরই নারী শ্রমিকদের সদস্য হওয়ার বিষয়টা গ্রহণ করা হয়, কিন্তু নামটা ওরকম বিদঘুটে রকমেরই থেকে যায়।
এখানেই নৈরাষ্ট্রবাদীদের কথা বলে নিই। কারণ তাদের সাথেই কমিউনিস্টদের বিরোধটা প্রথম আন্তর্জাতিকের মূল বিষয় ছিল। শ্রমিক রাষ্ট্রের ভাবনা বনাম সমাজের হাতে সব কিছুর দায়িত্বর ভাবনার দ্বন্দ্ব। সংগঠনের মধ্যে মার্ক্স বনাম বাকুনিন। নৈরাষ্ট্রবাদীরা মনে করে, শোষণহীন সমাজ তৈরি করতে গেলে কোনো রাষ্ট্র থাকলে চলবে না, গোটা ক্ষমতাটা থাকবে সমাজের হাতে; আর উল্টোদিকে কমিউনিস্টরা মনে করেন শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্র তৈরি হওয়াটা আবশ্যিক। বলা ভালো, এদের সাথেই রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে মার্ক্স তাঁর তত্ত্বকে অনেকাংশে বিকশিত করেছিলেন। কিন্তু একসাথে থাকাটা আর হয়ে ওঠেনি প্রথম আন্তর্জাতিকের মধ্যে। ১৮৭২ সালেই হেগে অনুষ্ঠিত পঞ্চম কংগ্রেসে সংগঠন আড়াআড়ি ভেঙে যায়-- কমিউনিস্ট শিবির আর নৈরাষ্ট্রবাদী শিবিরে। মাথায় রাখতে হবে, সময়টা ১৮৭২; প্যারী কমিউনের পরীক্ষা নিরীক্ষার ঠিক এক বছর পরেই। তাই নিয়েই তর্কবিতর্ক, বাদানুবাদ। মার্ক্সপন্থীদের বহিষ্কারের ফলে বাকুনিনপন্থীরা সে বছরই আলাদা কনফারেন্স করে। ১৮৭৩ থেকে ১৮৭৭ অবধি বাকুনিনরা ৫ম কংগ্রেসের ধারাবাহিকতায় আরও ৪টে কংগ্রেস আয়োজন করেন। আর ওদিকে মার্ক্সপন্থীরা ১৮৭৩ সালে ষষ্ঠ কংগ্রেসের পর ১৮৭৬ সালে মার্কিন দেশে ফিলাডেলফিয়ার অধিবেশনে সিদ্ধান্ত নিয়ে সংগঠন গুটিয়ে দেন।
তাহলে কী দেখলাম? প্রথম আন্তর্জাতিক থেকে দুটো ধারা তৈরি হল। একপক্ষের পতাকা লাল আর এক পক্ষের কালো। দুটো ধারাই রয়ে গেল। আলোচনায় আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি ১৮৮০-র দশকের একদম প্রথমে। এই দশকের শেষে আবার একবার কমিউনিস্ট আর নৈরাষ্ট্রবাদীরা একজোট হয়ে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক গড়বেন। কিন্তু সে আলোচনায় আমরা পরে যাব। কেননা সেই আলোচনা থেকে আমরা আর নৈরাষ্ট্রবাদীদের নিয়ে আলোচনা করব না। ফলে, সেই আলোচনা শুরুর আগে আমরা নৈরাষ্ট্রবাদীরা তারপর (১৮৮০) থেকে আজ অবধি কীরকমভাবে আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়লেন একটু দেখে নিই।
এদের নৈরাষ্ট্রবাদী আন্তর্জাতিক বা কালো আন্তর্জাতিক বলে বলব আমরা। ১৮৮১-তে তৈরি হল ইন্টারন্যাশানাল ওয়ার্কিং পিপল'স অ্যাসসিয়েশন। এটা ঐ দশকের শেষেই মুখ থুবড়ে পড়ল। ১৮৮৯-এ আবার তারা কমিউনিস্টদের সাথে মিলে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক তৈরি করল, এটা আগেই বলেছি, পরে আরও বিস্তারিত আলোচনা করব। যদিও এই মধুচন্দ্রিমা স্থায়ী হল না। ১৯০৭-এ নৈরাষ্ট্রবাদীরা আবার আলাদা হয়ে যায়। রাশিয়ার বিপ্লবের পরে তারা বলশেভিকদের দ্বারা পরিচালিত ট্রেড ইউনিয়নগুলোর আন্তর্জাতিকে (প্রফির্ণটার্ণ) যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করলেও অবশেষে তারা ১৯২২ সালে একত্রিত হয়; তৈরি হয় প্রথম আন্তর্জাতিকের আদলে নতুন 'ইন্তারন্যাশানাল ওয়ার্কিংমেন'স অ্যাসোসিয়েশন' (IWMA) যা পরে নাম পালটে হয় ইন্তারন্যাশানাল ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন (IWA)। বলতে গেলে সেটা আজও বর্তমান, তবে ২০১৮ সালে তার নামটা পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে ইন্তারন্যাশানাল কনফেডারেশন অফ লেবার্স। ১৯২২ থেকে ২০১৯ অবধি এদের ২৭টা আন্তর্জাতিক কনফারেন্স হয়েছে। ভালো কথা, এতদূর পড়ে আপনি ভাবলেন যাকগে, নৈরাষ্ট্রবাদীরা অন্তত সংঘবদ্ধ আছে। ভুল। এতক্ষণ যাদের কথা বলছিলাম এখানে, শেষমেষ শুধু অ্যানার্কো-সিণ্ডিক্যালিস্টরা থেকে গিয়েছে। না-অ্যানার্কো-সিণ্ডিক্যালিস্টরা আলাদা আলাদা আন্তর্জাতিক সংগঠন তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর।
১৯৪৮ সালে তৈরি হয় 'অ্যানার্কিস্ট ইন্টারন্যাশানাল'।
১৯৫৪ সালে 'লিবারটারিয়ান কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানাল'।
১৯৫৮ সালে 'অ্যানার্কিস্ট ইন্টারন্যাশানাল কনফারেন্স'।
১৯৬৮ সালে 'ইন্টারন্যাশানাল অফ অ্যানার্কিস্ট ফেডারেশনস বা (IFA)। এটা অ্যানার্কিস্টদের বেশ শক্তপোক্ত, দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক সংগঠন। এখনও আছে, ২০১৯ সালে এদের ১১তম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই শতকেও (২০০১ সালে) নতুন করে তৈরি হয়েছে ইন্টারন্যাশানাল লিবারটারিয়ান সলিডারিটি বা SIL। ২০১১-তে তৈরি হয়েছে ইউরোপিয়ান অ্যানারকিসমো কোঅর্ডিনেশন।
এই রে! একদম ভুল হয়ে গেছে। এই অ্যানার্কো সিণ্ডিক্যালিস্ট, লিবারটারিয়ান সোশ্যালিস্ট বা লিবারটারিয়ান কমিউনিস্ট- এরা কারা, এটা না বললে তো মুশকিল। একটু বলে নিই।
অ্যানার্কো-সিণ্ডিক্যালিস্টঃ- এরা মনে করে ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমেই শ্রমিকশ্রেণী রাজনৈতিক কর্মপন্থা চালাবে, তার মধ্যে দিয়েই শ্রেণী সমাজ গঠনের কাজ করবে। অর্থনৈতিক সংগ্রামের বাইরে তাদের আর কোনো রাজনৈতিক সংগ্রামকেও এরা অস্বীকার করে। আগে প্রুঁধোর নাম করেছিলাম, সেই প্রুঁধো এই তত্ত্বের প্রবক্তা।
লিবারটারিয়ান মার্ক্সবাদঃ- এই মতবাদ মনে করে মার্ক্সের পরিণত বয়সের লেখাগুলো যেমন গ্রুণ্ড্রিসে বা ফ্রান্সের গৃহযুদ্ধ ইত্যাদিতে মার্ক্স রাষ্ট্রহীন সমাজের ইঙ্গিত দিয়েছেন। একে কেন্দ্র করে একটা রাজনৈতিক দর্শন তৈরি হয় যা একদিকে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সংশোধনবাদী অবস্থানকে বিরোধ করে আর অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টির মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে, তার স্বৈরাচারের তত্ত্বকেও বিরোধ করে। শ্রমিকের মজুরী শ্রমকে এরা বিরোধ করে, আবার শ্রমিক রাষ্ট্র ও শ্রমিকের ভ্যানগার্ড পার্টির প্রয়োজনীয়তাকেও এরা অস্বীকার করে। এই তত্ত্বের সাথে প্রুঁধো, বাকুনিনের নৈরাষ্ট্রবাদের তত্ত্বকে মিশিয়ে লিবারেটারিয়ান সোশ্যালিজম ও লিবারেটারিয়ান কমিউনিজম, অ্যানার্কো-কমিউনিজমের তত্ত্ব তৈরি হয়েছে।
২) দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকঃ-
দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের ওরকম কোনো সাবেকী নাম নেই। ১৮৮১ থেকেই চেষ্টা চলছিল আবার একটা একটা আন্তর্জাতিক তৈরির। ১৮৮৯ সালের ১৪ই জুলাই একই দিনে প্যারিসে দুটো আলাদা জায়গায় আলাদা সম্মেলন করে পসিবিলিস্টরা (মূলত ফ্রেঞ্চ) আর অন্যদিকে মার্ক্সবাদীরা (মূলত জার্মান)। দুবছর পরে ১৮৯১ সালে, দ্বিতীয় সম্মেলনই তারা একত্রিত হয়। এই সংগঠনটা ১৯১৬ সাল অবধি কার্যকরী থেকেছিল। খুবই ভাঙাচোরা অবস্থায়, ১৯২০ সালেও কনফারেন্স হচ্ছে, কিন্তু তা খুব একটা ফলদায়ক নয়।
তারপর, রুশ বিপ্লবের পর, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক থেকে ভাঙা একটা অংশ নতুন করে সংগঠিত হয়ে, ১৯১৯ সালে তৈরি করে তৃতীয় আন্তর্জাতিক; এটা, 'কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক' হিসেবে পরিচিত হওয়ায়, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিককে সমাজতান্ত্রিক বা সোশ্যালিস্ট আন্তর্জাতিক নামে ডাকা শুরু হয়। নতুন করে এই সোশ্যালিস্ট ইন্টারন্যাশানাল তৈরি হয় ১৯২৩ সালে। তার গল্পটা বেশ ইন্টারেস্টিং। সেই প্রথমে আড়াই ইন্টারন্যাশানালের কথা বলেছিলাম। তার গল্পও আছে এখানে। সেই গল্পে আমরা পরে যাব।
১৮৮৯-এর প্যারিসে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসে হলের মধ্যে বিরাট একটা ব্যানারে বড় বড় করে "দুনিয়ার মজদুর এক হও" লিখে টাঙিয়ে দিয়েছিলেন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের এক গুরুত্বপুর্ন সদস্য পল লাফার্গ, তিনি আবার সম্পর্কে মার্ক্সের জামাই। বছরটা ছিল বাস্তিল দুর্গের পতনের শতবর্ষ। আন্তর্জাতিকের নেতাদের বিস্মরণ ভাঙতে আর জাতীয়তাবাদের ধারণাকে পরাস্ত করতেই এই উদ্যোগ।
এর সদস্য ছিল বিভিন্ন দল। প্রথম আন্তর্জাতিকের মত কেন্দ্রীয় সংগঠন ছিল না এটা। ছিল খানিক ঢিলেঢালা ধরণের। মূলত ২০টা দেশের সোশ্যালিস্ট আর লেবার পার্টি মিলে এই আন্তর্জাতিকটা তৈরি হয়। মার্ক্স ততদিনে মারা গিয়েছেন, এঙ্গেলস অবশ্য জীবিত। ঘটে গিয়েছে আমেরিকার হে মার্কেটের শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল জার্মানীর সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির। জার্মানীর কার্ল কাউটস্কি আর রাশিয়ার জর্জি প্লেখানভ ছিলেন এই আন্তর্জাতিকের মূল নেতৃত্ব। অ্যানার্কিজমের নানান ভাবনাকে যুক্তিতর্কে সম্পূর্ন পরাস্ত ক'রে, কমিউনিজমের নানান ভাবনার মধ্যে মার্ক্সের (এবং এঙ্গেলসের) মতবাদকে এই সংস্থার ভিত্তি হসেবে ঘোষণা করা হয় ১৮৯৬ সালে। এঙ্গেলস তখন মারা গিয়েছেন। আমরা মার্ক্সবাদ বলতে সাধারণভাবে যেটা বুঝি সেই ন্যারেটিভটা তৈরি হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের পথ চলার মাধ্যমেই, প্লেখানভ আর কাউটস্কির হাত ধরে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই ন্যারেটিভের বাইরেও কোনো কোনো চিন্তাবিদ পরবর্তীকালে মার্ক্সবাদের অন্য ন্যারেটিভও বানানোর চেষ্টা করেছেন। বিশেষভাবে বলতে হয় দেরিদার কথা। ভ্লাদিমির ইলিচ উইলিয়ানভ অর্থাৎ লেনিন রাশিয়ান সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের এক্সিকিউটিভ সদস্য হন ১৯০৫ সাল থেকে।
ইউরোপের নানান দেশ, তুরস্ক, ভারত, জাপান, মার্কিন দেশ, চিলি, আর্জেন্টিনা ইত্যাদী দেশের নানান সোশ্যালিস্ট দল এই আন্তর্জাতিকের সদস্য ছিল। ১৯০৪ এর কংগ্রেসে ভারতের দাদাভাই নওরোজী ভারতের স্বাধীনতা সংক্রান্ত একটা প্রস্তাব এনেছিলেন, এটা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে।
১লা মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা অর্থাৎ দিনে ৮ ঘন্টা শ্রমের অধিকার সহ শ্রমিকদের আরও বহু অধিকারের আইনী স্বীকৃতি এবং ৮ ই মার্চকে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করার বিষয়টা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকেরই কৃতিত্ব।
দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের মধ্যে বিতর্ক বরাবরই ছিল। ১৮৯৮ থেকে ১৯০৩ অবধি চলে বার্নস্টাইনের নেতৃত্বে সংস্কারবাদী প্রচেষ্টা, তার বিরোধিতাও হয়। বড়সড় বিতর্ক শুরু হয় সাম্রাজ্যবাদী মহাযুদ্ধ বা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে। বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কমিউনিস্টদের করণীয় কী? এই নিয়ে বিতর্ক। রাশিয়ার ইতিমধ্যে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে দুটো অংশ বিরাজ করছে- বলশেভিক আর মেনশেভিক। বিতর্কে একদিকে অংশ নেয় লেনিন নেতৃত্বাধীন রাশিয়ার বলশেভিক পার্টি আর উল্টোদিকে কাউটস্কির নেতৃত্বাধীন জার্মানীর সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি। দ্বিতীয় দলে রাশিয়ার মেনশেভিক অংশ জড়িয়ে পড়ে, তারাই তখন রাশিয়ার পার্টির সংখ্যাগুরু। হাঙ্গেরী আর সার্বিয়ার পার্টি ছাড়া সকলেই ছিল বলশেভিকদের বিরুদ্ধ শিবিরে। আন্তর্জাতিকের ১৯১২ সালের কংগ্রেসের গৃহীত সিদ্ধান্তের কার্যত বিরুদ্ধে গিয়ে, বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নিজ নিজ দেশের শাসকদের পক্ষে দাঁড়িয়ে এক জাতীয়তাবাদী স্বার্থ রক্ষার লাইন নেয় এই অংশটা। আর বলশেভিক পার্টি সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে শ্রেনীযুদ্ধে পরিনত করে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে ১৯১৭ সালে। আর এই বিতর্কের মাধ্যমেই দুর্বল হয়ে যায় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের ঐক্য।
দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সে অর্থে কখনোই উঠে যায়নি। ১৯১৪ সালে বলশেভিকরা সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। বলশেভিক পার্টি বিপ্লবের পরে, ১৯১৯ সালে, 'তৃতীয় আন্তর্জাতিক' বা 'কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক' তৈরি করে, সে আলোচনাই আমরা বেশি গুরুত্ব নিয়ে করব। তার আগে বরং আমরা দেখা নিই, বাকি অংশটা এরপর কী করল?
নিজেদের সোশ্যালিস্ট পরিচিতি নিয়েই আন্তর্জাতিক সংগঠনের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় তারা।
★ আড়াই আর সাড়েতিন আন্তর্জাতিকঃ-
সাবেকি নাম ইন্টারন্যাশানাল ইউনিয়ন অফ সোশ্যালিস্ট পার্টিস। ১৯২১ এর ২৭শে ফেব্রুয়ারি, অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরে দশটার মত সোস্যালিস্ট দলের সম্মেলনের মাধ্যমে এটা তৈরি হয়। কার্যত তখন দ্বিতীয় এবং তৃতীয় আন্তর্জাতিক, দুটোই উপস্থিত; দুপক্ষের ব্যাপারেই এদের কিছু সমালোচনা ছিল, বিশেষত দুপক্ষের গাঁটামি নিয়ে। এদের মূল বক্তব্য ছিল, প্রতিটা দেশের বিশেষত্বের ব্যাপার আরো বেশি বিবেচনার মধ্যে নেওয়ার ক্ষেত্রে জোর দিতে হবে। এবং এরা দুটো আন্তর্জাতিকের ঐক্যের ব্যাপারে বেশ চেষ্টা করেছিল। ঠাট্টার ছলে এদের আড়াই (2+1⁄2) আন্তর্জাতিক বলা হয়। এই জোটের সবচেয়ে বড় দল জার্মানীর USPD বা ইউনাইটেড সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি ১৯২২ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর জার্মানীর সবচেয়ে বড় দল তথা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সব থেকে বড় দল SPD-এর সাথে মিশে গেলে আড়াই আন্তর্জাতিক প্রায় অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। ১৯২৩ সালের জার্মানীর হামবুর্গ শহরে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের বিরোধী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দলগুলোর সাথে ঐক্য সম্মেলনের মাধ্যমে তৈরি করে লেবার অ্যাণ্ড সোশ্যালিস্ট ইন্টারন্যাশানাল। এটাকেই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের উত্তরসূরী বলা যায়। ১৯২৩ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত এটা কার্যকরী ছিল।
১৯৩০-এর দশকে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের স্তালিনবাদ আর নব্য দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সংশোধনবাদ দুটোরই সমালোচনা করে আরও একটা আন্তর্জাতিক গড়ে উঠেছিল। এটাকে সাড়ে তিন আন্তর্জাতিক বলা হয়, অবশ্যই নিজেরা এরকম নাম রাখেনি, ঠাট্টাচ্ছলেই বলা হয়।
কমিউনিস্ট ওয়ার্কারস' ইন্টারন্যাশানাল গড়ে উঠছে ঠিক এই সময়ে। ১৯২২। জার্মানির কমিউনিস্ট ওয়ার্কারস পার্টি ছিল এর প্রধান উদ্যোক্তা। জার্মানির কমিউনিস্ট ওয়ার্কারস পার্টি বা KPDA তৈরি হয়েছিল ১৯২১ সালে জার্মানীর কমিউনিস্ট পার্টি থেকে ভেঙে বেরিয়ে। এদের সাথে বুলগেরিয়া, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, ব্রিটেন এমনকি রাশিয়ারও কিছু সমমনোভাবাপন্ন কিছু বামপন্থী কমিউনিস্ট গ্রুপের জোট হিসেবে এটা আত্মপ্রকাশ করেছিল। বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা এরা নিয়ে উঠতে পারেনি, কার্যত ১৯২৭ সালেই এদের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়। ৩০ এর দশকের প্রথমের দিকেও নেদারল্যাণ্ড থেকে এই সংগঠনের কিছু প্রকাশনার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
বোঝাই যাচ্ছে, আন্তর্জাতিকের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জার্মানী আর রাশিয়ার বিভিন্ন বামপন্থী দলগুলোর ব্যাপারে একটা ধারণা থাকা প্রয়োজনীয়।
আমরা বরং আবার নবগঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের আলোচনায় ফিরি। মনে করিয়ে দিই, ১৯২৩ সালে তৈরি হল শ্রমজীবী ও সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক। এর নেতা হিসেবে থেকে গেলেন বৃদ্ধ কাউটস্কি আর জার্মানীর সেই প্রাচীন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিটা। আর সেই পার্টিতেই ফিরে এলেন একদা সমালোচিত বার্নস্টাইন। এঁদের ভিত্তি ছিল মার্ক্সবাদ কিন্তু এঁরা মার্ক্সবাদের ওপর লেনিন বা পরবর্তীকালে স্তালিনের সংযোজনগুলোকে অস্বীকার করতেন। এঁরা মনে করতেন, পার্লামেন্টারী ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে অন্যান্য বুর্জোয়া দলগুলোর সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করেও সমাজ পরিবর্তন সম্ভব। সারা দুনিয়াজুড়ে সোভিয়েত বিরোধী কার্যকলাপ আর সমালোচনার আখড়া হয়ে উঠেছিল এই ইন্টারন্যাশানাল। সোভিয়েত সমালোচনার আরও একটা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ফ্রাঙ্কফুট স্কুল। সে আলোচনা আমরা অন্য কোথায় করব। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে এই আন্তর্জাতিকটা বিলুপ্ত হয়ে যায়। বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৫১ সালে আবার পুনর্গঠিত হয় সোশ্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনাল নাম নিয়ে। এটা এখনও কার্যকরী আছে। ভারতের দুটো পার্টি এই আন্তর্জাতিক সংগঠনটার সদস্য- ভারতের জাতীয় কংগ্রেস আর সমাজবাদী পার্টি।
৩) তৃতীয় আন্তর্জাতিক বা কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানালঃ-
দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের ব্যর্থতা আর রাশিয়ার বিপ্লবের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল দেশে দেশে নতুন দল, নতুন আন্দোলনের বাস্তবতার জন্ম দিল যা আর পুরনো ধরণের আন্তর্জাতিকের মাধ্যমে ধারণ করা সম্ভব ছিল না। নতুন ধরণের দলগুলো সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক নামের বদলে নামাঙ্কিত হল কমিউনিস্ট পার্টি নামে। পার্টি গঠন কেমন হবে, তার গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতি বা পার্টি শৃঙ্খলা কেমন হবে তা লেনিনের তত্ব অনুযায়ী তৈরি হল। দরকার হয়ে পড়ল দেশে দেশে গড়ে ওঠা ‘কমিউনিস্ট’ নামাঙ্কিত পার্টিগুলোর নতুন আন্তর্জাতিক সংগঠনের। ১৯১৯-এর ২রা মার্চ মস্কোয় প্রথম কংগ্রেসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা হল কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানাল বা কমিন্টার্ন।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এর নেতৃত্বে ছিল রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি। তার পরেই নাম করতে হয় জার্মানীর স্পার্টাকাস লীগ, যা পরে কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। রোজা লুক্সেমবার্গ, কার্ল লিবকনেখট, কার্ল রাদেক, পল লেভি এই দলের মূল নেতৃত্ব ছিলেন। প্রথম কংগ্রেসে উপস্থিত ছিলেন ৩২টা দেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিরা। ১৯২০-র দ্বিতীয় কংগ্রেস ছিল খুব গুরুত্বপুর্ণ। এই কংগ্রেসেই ঘোষিত হয় "struggle by all available means, including armed force, for the overthrow of the international bourgeoisie and the creation of an international Soviet republic as a transition stage to the complete abolition of the state"। এখানেই সেই বিখ্যাত ২১ দফা শর্ত তৈরি হয়। এই ২১ দফার মাধ্যমেই কমিউনিস্ট আর সোশ্যালিস্টদের মধ্যে সীমারেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিকে অন্তর্ভুক্তির জন্য কোনো পার্টিকে ২১ দফার সবকটায় সম্মত হতে হত। প্রসঙ্গত বলতে হয়, এর ১১ নম্বর ধারা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয় কংগ্রেসে। মেক্সিকোর কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি মানবেন্দ্র নাথ রায় প্রশ্ন তুলেছিলেন উপনিবেশে কমিউনিস্টদের করণীয় নিয়ে, অর্থাৎ লেনিনের তৈরি করা প্রাথমিক প্রস্তাবের লাইন নিয়ে। কী সেটা? উপনিবেশের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দলগুলোর (ভারতের ক্ষেত্রে জাতীয় কংগ্রেস) সাথে একসাথে সংগ্রাম না করে, কমিউনিস্টদের পৃথক সংগ্রাম গড়ে তোলার যে প্রস্তাব রায় রাখেন; তা শেষমেশ লেনিনের প্রাথমিক প্রস্তাবের বদলে গৃহীত হয়। এই এম.এন. রায় অবশ্য অনেক পরে দেশে ফিরে নিজেই জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন। সে আলাদা কথা, এখানে প্রাসঙ্গিক নয়।
দ্বিতীয় কংগ্রেসের পরে মানবেন্দ্রনাথ রায় ওরফে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য আর মেক্সিকোতে ফিরে যাননি। ১৯২১ সালে কয়েকজন ভারতীয়কে সঙ্গে নিয়ে তাশখন্দে খুলে ফেললেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, আর সে বছরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিকের কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্ব করলেন ভারতের পার্টির। বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারতের মূলধারার কমিউনিস্ট আন্দোলন, পার্টি সে সিপিআই, সিপিআইএম, সিপিআই(এমএল) ইত্যাদি ধারা হোক বা আরএসপি, এসিউসিআই ধারা হোক - সকলেই তৃতীয় আন্তর্জাতিকপন্থী।
সব মিলিয়ে ৭টা কংগ্রেস আর ১৩টা নির্দিষ্ট বিষয়ে প্লেনাম হয় এই আন্তর্জাতিকটা উঠে যাওয়ার আগে পর্যন্ত। ১৯৩৫-এর কংগ্রেস, অর্থাৎ শেষ কংগ্রেস খুব গুরুত্বপুর্ণ কারণ এখানেই ফ্যাসীবাদ নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা, তর্কবিতর্ক হয়; বহুকথিত দিমিত্রভের পপুলার ফ্রন্টের লাইন গৃহীত হয়-- যার ফলে পরের দশকে ফ্যাসীবাদকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয় কমিউনিস্টরা।
১৯৪৩ সালে সোভিয়েত রাশিয়া বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেওয়ার এক বছরের মাথায় মিত্রশক্তির অন্যান্য দেশের সাথে সংঘাত এড়ানোর অজুহাতে স্তালিন (১৫ই মে) কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের বিলুপ্তি ঘোষণা করেন।
জার্মানীসহ ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে বারবার বিপ্লবের প্রচেষ্টাগুলোর পেছনে শক্তপোক্ত সাহায্য-সমর্থনের ভূমিকা পালন করেছে তৃতীয় আন্তর্জাতিক, ভারতসহ এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার উপনিবেশগুলোর সংগ্রামেও সাহায্যকারীর ভূমিকা নিয়েছে, চীনের বিপ্লবে সদর্থক ভূমিকা রেখেছিল তৃতীয় আন্তর্জাতিক। তবুও বলতে হয় কমিন্টার্ন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিদেশনীতি দ্বারাই সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত ছিল এবং শেষ বিচারে এটা সোভিয়েতের বিদেশ দপ্তরেই পরিণত হয়ে গিয়েছিল।
যুদ্ধ শেষ হলে ১৯৪৭ সালে তৈরি হল কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর নেটওয়ার্ক ধরণের একটা সংগঠন-- কমিউনিস্ট ইনফর্মেশন ব্যুরো বা কমিনফর্ম। হেডকোয়ার্টার হল প্রথমে যুগোশ্লাভিয়ার বেলগ্রেডে, পরে বুখারেস্টে। ১৯৫৬ সালে এটাও উঠে গেল।
এখানেই শেষ তৃতীয় আন্তর্জাতিকের। পরের দশকে শুরু হল তৃতীয় আন্তর্জাতিকপন্থী দুটো বড় দলের, দুটো বড় সমাজতান্ত্রিক দেশের মধ্যে তাত্ত্বিক বিতর্ক। চীনের পার্টির আর সোভিয়েতের কমিউনিস্ট পার্টির। আন্তর্জাতিক মতাদর্শগত মহাবিতর্ক। সেই বিতর্ককে সামনে রেখে বিশ্বজুড়ে তৃতীয় আন্তর্জাতিকপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিগুলো দুটো শিবিরে বিভাজিত হয়ে গেল। দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোতেও বিভাজন হল। চীনপন্থীরা ১৯৮৪ সালে রিভলিউশনারি ইন্টারন্যাশানালিস্ট মুভমেন্ট বা সংক্ষেপে RIM নামে একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে, যার হেডকোয়ার্টার ছিল ফ্রান্সে। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, নেপালের মাওপন্থী কয়েকটি দল এর সদস্য থাকলেও খোদ চীনের পার্টি রিমের অংশ ছিল না। স্বাভাবিকভাবে এটাও বেশিদিন টেঁকেনি। ২০০১ সালে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন মাওবাদীদল মিলে তৈরি করে Coordination Committee of Maoist Parties and Organisations of South Asia বা সংক্ষেপে কমপোসা নামে একটা আম্ব্রেলা সংগঠন।
৪) চতুর্থ আন্তর্জাতিকঃ-
১৯৩৮ সালে রাশিয়ার বিপ্লবের অন্যতম নেতা ট্রটস্কি সোভিয়েত দেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে ফ্রান্সে তাঁর বিভিন্ন দেশের অনুগামীদের নিয়ে নতুন আন্তর্জাতিক গঠন করেন। একদিকে যেমন পুঁজিবাদকে ছুঁড়ে ফেলে ‘সারা পৃথিবীতে’ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ডাক ছিল, তেমনই ছিল স্তালিনবাদের হাতের পুতুল হয়ে যাওয়া তৃতীয় আন্তর্জাতিককে অস্বীকার করার। তাঁদের মত ছিল, তৃতীয় আন্তর্জাতিকের পক্ষে আর বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়ে শ্রমিকশ্রেণীর ক্ষমতায়ণ সম্ভব নয়। ট্রটস্কি আসলে নিজেও সেই সময়ে একদেশে সমাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার সম্ভবনার বদলে দুনিয়া জুড়ে (সমস্ত দেশে) সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলছিলেন, আর বলছিলেন গণতন্ত্র ছাড়া সমাজতন্ত্র টিকতে পারে না; তাঁর চোখে তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি অবক্ষয়ী শ্রমিক রাষ্ট্র। তিনের দশকের গোড়া থেকেই ট্রটস্কিবাদও সোভিয়েত বিরোধী চর্চার আরও একটি কেন্দ্র হয়ে ওঠে, সেটাই চতুর্থ আন্তর্জাতিক গড়ে ওঠার মাধ্যমে সাংগঠনিক রূপ পায়। কিন্তু তারপরেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, বহু চেষ্টাতেও চতুর্থ আন্তর্জাতিক সেই টালমাটাল সময়ে বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারেনি। ট্রটস্কি নিজে খুন হন; নাজি আর জাপান সরকারের হাতে ট্রটস্কিপন্থীরা প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
যুদ্ধ শেষ হলে ১৯৪৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্ব কংগ্রেসে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা হয় কিন্তু অচিরেই এই সংগঠনে ভাঙন দেখা যায়। বিতর্কটা ছিল ট্রটস্কিবাদের সংশোধনবাদ বনাম ধ্রুপদী ট্রটস্কিবাদের। ১৯৫৩ সালে তৈরি হয় নতুন একটা সংগঠন, ইন্টারন্যাশানাল কমিটি অফ ফোর্থ ইন্টারন্যাশানাল বা ICFI। ১৯৬৩ সালে একবার একত্রীকরণের চেষ্টা হয়। তারপর থেকে কতবার যে ভাঙন আর একীকরণের প্রক্রিয়া চলেছে তার ইতিহাস বলে শেষ করা যাবে না। এতগুলো চতুর্থ আন্তর্জাতিকপন্থী আন্তর্জাতিক তৈরি হয়েছে যে, চতুর্থ আন্তর্জাতিকের মাধ্যমে আর নতুন কিছু হওয়া সম্ভব নয়; তাই কিছু মানুষের মনে হল যে, চলো পঞ্চম আন্তর্জাতিক তৈরি করা যাক। তবে আর আলাদা করে পঞ্চম আন্তর্জাতিক নিয়ে আলোচনায় প্রবেশ না করাই ভালো। প্রসঙ্গত বলতে হয়, এর আগে কোনো আন্তর্জাতিকের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন আন্তর্জাতিক তৈরির এমন কোনো যুক্তি ছিল না। যাই হোক এখনো অবধি তথ্য সংগ্রহ করে ৫০টির মত চতুর্থ আন্তর্জাতিকপন্থী আন্তর্জাতিক সংগঠনের নাম পাওয়া যাচ্ছে, তার মধ্যে ২০টির মত আন্তর্জাতিক সংগঠন এখনো উপস্থিত আছে, আর আরও ৩০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সংগঠন তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে নেই, উঠে গেছে।
আজ নতুন করে প্রকৃত একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রয়োজনের কথা বহু মানুষ ভাবছেন বটে; কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা বিশেষ তত্ত্বের বিকাশ, তার সাথে সম্পর্কিত নতুন ধরণের সংগঠন গড়ে ওঠা কিংবা ইতিহাসের মোড় ঘোরানো কিছু ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে; আর অবশ্যই যোগ্যতম নেতৃত্বকে কেন্দ্র করেই কার্যকরী আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে উঠেছিল, সেই সন্ধিক্ষণের জন্যে অপেক্ষা করতেই হবে।
লেখা - Arijit Chakraborty
ডিজাইন - বাপ্পাদিত্য