22/07/2022
কৃষি জমিতে মাছের ভেড়ি করতে দেব না। তৃণমূলী হুমকি উড়িয়ে প্রতিরোধী মেজাজেই মাঠে নামলেন সবংয়ের রামভদ্রপুর মৌজার কৃষকরা।
নিজেদের জমিতে চাষ শুরু করার জন্য ভেড়ির বাঁধ কেটে মাটি ফেলে দিলেন কৃষিজমিতে। শাসকদলের মদতপুষ্ট ভেড়ি সিন্ডিকেটবাহিনীর দুষ্কৃতীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও পিছু হটতে বাধ্য হলো। প্রথমদিনেই চার জায়গায় ভেড়ির বাঁধ কেটে জমা জল বের করে দিলেন কৃষকরা।
সরাসরি প্রত্যাঘাতের লড়াইয়েই নামলেন কৃষকরা। নিছক অনুরোধ, অনুনয়-বিনয় নয়, মুখোমুখি লড়াইয়েই নিজের জমিতে চাষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেন রামভদ্রপুরের কৃষকরা।
কৃষকরা যখন নিজেদের জমিতে চাষ শুরু করার জন্য ভেড়ির বাঁধ ভেঙে জল বের করে দিচ্ছে তখন সেই রামভদ্রপুর মৌজায় শয়ে শয়ে খেতমজুর, গ্রামবাসীরা এই প্রত্যাঘাতের লড়াইয়ে সংহতি জানিয়ে মিছিলে শামিল হলেন। কৃষিজমিতে কৃষিকাজের পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে জমায়েত হয়ে সভাও করছেন।
তিনফসলা কৃষিজমিতে ভেড়ি নয়, প্রাণ গেলেও চাষের জমি ছাড়ব না— এই অঙ্গীকার নিয়ে ইতিমধ্যে চারবার প্রতিরোধ করেছেন সবংয়ের রামভদ্রপুর মৌজায় কৃষকরা। কৃষক রমণীরা গত ২৯মে ভোররাতে জ্বলন্ত হুলা নিয়ে ভেড়ি সিন্ডিকেটের সশস্ত্র বাহিনীকে জানকবুল লড়াই করেই হটিয়েছেন রক্তাক্ত হয়েও। বৃহস্পতিবার তাঁদের জমিতে চাষ শুরু করার জন্য জমি দখল নিলেন। গত ২০ জুন জেলা শাসকের দপ্তরে অভিযানে তাঁদের চাষজমিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন হাজারের বেশি কৃষক পরিবার। কিন্তু একমাস অপেক্ষা করার পরও প্রশাসন সেই দায়িত্ব পালন না করায় বৃহস্পতিবার নিজেরাই কৃষিজমিতে চাষ শুরু করলেন।
ভূমি দপ্তরের গাফিলতির কারণে এবং এলাকার শাসক দলের নেতা বিধায়ক মন্ত্রীর মদতে শাসকদলের ভেড়ি সিন্ডিকেট বাহিনী বন্দুক ঠেকিয়ে রাতের অন্ধকারে জোর করে ভেড়ি তৈরির কাজ শুরু করে। কৃষকদের কোনও অনুমতি না নিয়ে, চাষ জমির চরিত্র বদল না করেই এমন কাজ শুরু হলেও ব্লক, মহকুমা ও জেলা ভূমি দপ্তর সব জেনেও নীরব থেকেছে। আদালতেও গেছেন কৃষকরা।
এমন আন্দোলনে শামিল কৃষক কালিপদ চৌধুরি, বানেশ্বর আদক জানান, তাঁরা তৃণমূল করতেন। নভেম্বর মাসে শীতের রাতে বন্দুক ঠেকিয়ে ভেড়ি তৈরির জন্য চাপ দেয় তৃণমূলের ভূমি কর্মাধ্যক্ষ তপন হাজরা সহ তার লোকজন। কৃষকরা তৃণমূলী সাংসদ মানস ভূঁইয়ার কাছে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার চেয়েছিলেন। মানস ভূঁইয়া কথা দিয়েছিলেন ভেড়ি করতে দেওয়া হবে না। যদিও এখন তিনি নীরব। বিপুল টাকার খেলা, অভিযোগ কৃষকদের।
ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই কৃষকরা প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে শামিল হয়। গড়ে ওঠে রামভদ্রপুর কৃষি ও কৃষক বাঁচাও সংগ্রাম কমিটি। সারা ভারত কৃষকসভা ও খেতমজুর সংগঠন প্রথম থেকেই এই আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। নবান্নতে অভিযোগ জানিয়েও কোনও পদক্ষেপ নেই। হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় কৃষকরা। ভেড়ি তৈরি স্থগিতাদেশ জারি হয়েছে। তারপরেও রাতের অন্ধকারে মেশিন নামিয়ে সেই কাজ শুরু করে সিন্ডিকেট বাহিনী।
আন্দোলনে শামিল কৃষক নারায়ণ মান্না, প্রতাপ গুচ্ছাইত, মদন খাঁটা, শংকর প্রামানিক, সবিতা গুচ্ছাইত, যমুনা ঘাটারা বলেন, তাঁরা এর আগে রক্তাক্ত হয়েছেন। এখন জীবন দিতে হলে দেব, আমাদের চাষ জমিতে ভেড়ি তৈরি করতে দেব না। সবে চার জায়গায় ভেড়ির বাঁধ কেটেছি। এরপর পুরো বাঁধের মাটি চাষের জমিতে ফেলব আমরা গ্রামের সব কৃষকরা। কৃষকদের অভিযোগ, ভূমি দপ্তরও এই ঘটনায় জড়িত, হাইকোর্টে ভূয়ো রিপোর্ট জমা দিয়ে শাসক দলের সিন্ডিকেট বাহিনীর হাত শক্ত করতে ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছে। সেই ভূমি দপ্তর এখনও পর্যন্ত এলাকায় জনশুনানিতে না এসে গোপনে রিপোর্ট তৈরি করেছে, বলে কৃষকরা অভিযোগ দায়ের করেছে।
কৃষকদের জমিতে চাষ শুরু সহ সেই পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল, সভাতে শামিল সহ বক্তব্য রাখেন শ্রমিক নেতা গোপাল প্রামানিক, মহিলা নেত্রী গীতা হাঁসদা, কৃষক নেতা প্রাণকৃষ্ণ মণ্ডল, খেত মজুর সংগঠনের নেতা অমলেশ বোস, কৃষি ও কৃষক বাঁচাও সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক চন্দন গুচ্ছাইত এবং রীতা জানা প্রমুখ।