31/03/2026
চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের মদন ত্রয়োদশী। কোচবিহারের রাজবংশী সম্প্রদায় আজকের দিনে মদন কামদেবের পূজা করে থাকেন।
চৈত্রমাসের শুক্লা ত্রয়োদশীর দিন অর্থাৎ মদন ত্রয়োদশীর দিন কোচবিহারের দিনহাটার খলিসা গোসানিমারি গ্রামে মদনকামদেবের পূজা ও উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই পূজাটি বহু প্রাচীন। উৎসবের সময় একটি বাঁশ পুঁতে তার আগাগোড়া কাপড় দিয়ে মুড়ে এবং মাথায় কৃত্রিম চুল লাগিয়ে সেই বস্ত্রাচ্ছাদিত বাঁশকেই মদন কামদেবের প্রতীক হিসাবে পূজা করা হয়। কামদেবের প্রতীক বাঁশ বলেই বোধহয় এই পূজা ও উৎসবটি স্থানীয় অঞ্চলে বাঁশ মেলা বলে খ্যাত। এই উপলক্ষে একটি মেলাও বসে।
নাগরেরবাড়ী গ্রামে প্রতি বছর চৈত্রেমাসের মদন চতুর্দশীতে মদনকাম পূজা হয়। এই অঞ্চলে বড়বাঁশ নামে একজাতীয় বাঁশ জন্মায়। এর অগ্রভাগে চামর দেওয়া হয় এবং সম্পূর্ণ বাঁশটিকে নানা রঙের কাপড় দিয়ে আবৃত করা হয়। প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের পর আতপ চালের গুড়োর সাথে দুধ ও গুড় মিশিয়ে লাড্ডু তৈরি করা হয় এবং তিনদিন ধরে ওই লাড়ু দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। পূজার তৃতীয় দিনে ব্রাহ্মণ দিয়ে হোমের ব্যবস্থা হয় এবং শোভাযাত্রা বার করা হয়। এতে খুবই আমোদপ্রমোদ হয়।
সিঙ্গিমারি মদনাকুড়া গ্রামে প্রতি বছর চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে মদন চতুর্দশীর দিন মদনদেবের পূজা হয়। পূজাটি বেশ প্রাচীন। গোসানিমারি গ্রামের কামদেবের পূজার মতো এই পূজারও প্রধান প্রতীক বাঁশ। খুব লম্বা একটা বাঁশ কেটে তাকে নতুন কাপড়ে মুড়ে তার মাথায় চামর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। তারপর একটি মাটির বেদী তৈরি করে সেই বেদীতে বাঁশটিকে পুঁতে তার চারিদিকে লাল নিশান দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। উৎসবট আসলে তিনদিন ধরে চলে। দ্বাদশীর দিন বাঁশ উঠানো হয়, অর্থাৎ বেদীতে বাঁশটিকে তোলা হয়। ত্রয়োদশীর দিন হোম এবং চতুর্দশীর দিন পূজান্তে বাঁশটিকে বিসর্জন দেওয়া হয়। পূজার সময় অনেকে মানত দেন। প্রধানত জোড়া পায়রাকেই মানত দেওয়া হয়। পায়রা দুটিকে উৎসর্গ করার পর ছেড়ে দেওয়া হয়- তারা উড়ে যায়। অনেকে চাল, কলা, দুধ, মিষ্টি ইত্যাদি মানত করেন।
সংস্কৃত কাম-দেব শব্দটির অর্থ 'দিব্য প্রেম' বা 'প্রেমের দেবতা'। অর্থাৎ মানুষের মনে কাম দেন যে সত্তা। দেব শব্দের অর্থ দিব্য বা স্বর্গীয়; কাম শব্দের আক্ষরিক অর্থ ইচ্ছা, কামনা বা বাসনা, বিশেষত শারীরিক প্রেম বা যৌনতার ক্ষেত্রে। বিষ্ণুপুরাণ ও ভাগবত পুরাণে (৫।১৮।১৫) দেবতা কাম্যদেব বিষ্ণুর অপর নাম কামদেব। শব্দটি কখনও কখনও দেবতা মদন ও শিবের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবার সংস্কৃত গ্রন্থ প্রায়শ্চিত পদ্যত-এর রচয়িতার নামও কামদেব। অন্যদিকে কৃষ্ণের অপর নাম কামদেব; কখনও কখনও আবার শব্দটি কৃষ্ণের উপাধি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অগ্নির অপর নাম কাম। এই নামটি ঋগ্ববেদেও ব্যবহৃত হয়েছে (ঋগ্বেদ ৯, ১১৩।১১)। অথর্ববেদে 'কাম' যৌনাকাঙ্ক্ষা অর্থে নয় বরং 'সমস্ত পৃথিবীর মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
কামদেবকে এক পক্ষধারী সুদর্শন যুবকরূপে কল্পনা করা হয়। কামদেবের নাসিকা সুচারু, ঊরু, কটি ও জঙ্ঘা সুবৃত্ত; কেশ নীলাভ ও কুঞ্চিত। তার বক্ষ সুবিশাল। তার চক্ষু, মুখ পদতল ও নখ রক্তাভ। গায়ে বকুলের ঘ্রাণ। মকর এর বাহন। তার হাতে থাকে ধনুর্বাণ। তার ধনুকটি ইক্ষুনির্মিত এবং সেই ধনুকের গুণটি মৌমাছি দিয়ে তৈরি। তার বাণ পাঁচ প্রকারের সুগন্ধী পুষ্পনির্মিত।এই পাঁচ প্রকার পুষ্প হল : অশোক, শ্বেত ও নীল পদ্ম, মল্লিকা ও আম্রমঞ্জরী। ( তথ্যসূত্রঃ পশ্চিমবঙ্গের পূজাপার্বণ ও মেলাঃ অশোক মিত্র সম্পাদিত, বিভিন্ন পুরাণ)

31/03/2026
19/03/2026